জিন্দাপীর: কবরের ভেতর থেকে কোরআন পাঠের জনশ্রুতি

ইতিহাস ও জনশ্রুতিসুলতানি আমল ও খান জাহানপনের শতক (জনশ্রুতি লিপিবদ্ধ ১৯০৮–১৯১৪)ঠাকুর দিঘির উত্তর-পশ্চিম কোণ, খানজাহান আলী মাজার এলাকা, বাগেরহাট সদর

‘জিন্দা’ মানে জীবিত। খানজাহানের এক অনুচরের কবরকে লোকে বলে জীবিত পীরের মাজার—কারণ বিশ্বাস, তিনি আজও কবরের ভেতর কোরআন পড়ছেন।

মসজিদ ও মাজার বাস্তব এবং সংরক্ষিত। কবরের মাঝের সমাধিটি জিন্দাপীরের—এটি স্থানীয় জনশ্রুতি; সাধকের প্রকৃত নাম অনিশ্চিত। স্বর্ণমুদ্রা পাওয়া, কোরআন হাতে কবরে নেমে যাওয়া বা দাফনের সময় উঠে বসার গল্প জনশ্রুতি।

ঠাকুর দিঘির উত্তর-পশ্চিম কোণে, খানজাহানের সমাধি থেকে অল্প দূরে এক গম্বুজের ছোট একটি মসজিদ, পাশে একটি মাজার। লোকে বলে জিন্দাপীরের মাজার। ‘জিন্দা’ মানে জীবিত—জীবিত পীর। নামটির পেছনে আছে অলৌকিক কাহিনি, আর সাধকের আসল পরিচয় নিয়ে আছে ধোঁয়াশা।

সতীশচন্দ্র মিত্র (১৯১৪) খানজাহানের সঙ্গীদের তালিকায় ‘আহম্মদ শখা (জিন্দা পীর)’ নাম দিয়েছেন, আবার একই বইয়ে লিখেছেন, জিন্দাপীর আসল নাম নয়, উপাধি; ফকিরের প্রকৃত নাম জানার উপায় নেই। ১৯০৮ সালের খুলনা গেজেটিয়ারে তাঁর নাম আহমদ আলী, ‘জিন্দা ফকির’ নামেও পরিচিত। প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরও বলছে, মাঝের কবরটি সাধক জিন্দাপীরের বলে স্থানীয় জনশ্রুতি আছে। মিত্রের মতে তিনি খানজাহানের প্রিয় অনুচর ছিলেন, আর অলৌকিক ক্ষমতার জন্য খ্যাত ছিলেন।

নামকরণের দুটি জনশ্রুতি লিপিবদ্ধ আছে। মিত্র যে গল্প শুনেছিলেন: জিন্দাপীর এত ধর্মনিষ্ঠ ছিলেন যে প্রতি রাতে নামাজের পর আল্লাহর রহমতে স্বর্ণমুদ্রা পেতেন, আর সকালেই তা দান করে দিতেন, কিছুই জমাতেন না। একদিন তাঁর স্ত্রী কিছু অর্থ জমিয়ে রাখলেন; সেদিন থেকে সেই দান বন্ধ হয়ে গেল। কিছুদিন পর পীর কোরআন হাতে পড়তে পড়তে কবরে নেমে গেলেন, আর উঠলেন না। লোকের বিশ্বাস, তিনি আজও কবরের ভেতর কোরআন পড়ছেন, নিষ্ঠাবান মানুষ সেই শব্দ শুনতে পান। গেজেটিয়ারের রূপটি আলাদা: দাফনের সময় তিনি নাকি উঠে বসে শোকার্তদের বলেছিলেন তাঁর কোরআন এনে দিতে—তাই ‘জিন্দা ফকির’।

মসজিদটি খানজাহানি রীতির ছোট এক নিদর্শন। প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের বিবরণে এটি বর্গাকার, এক গম্বুজের; চার কোণে অষ্টভুজ বুরুজ, পূর্বে তিনটি ও উত্তর-দক্ষিণে একটি করে খিলান দরজা, আর পশ্চিমে পোড়ামাটির ফুল-লতাপাতায় সাজানো মিহরাব। একসময় অবহেলায় এর দশা খারাপ হয়েছিল—১৯০৮ সালের গেজেটিয়ারে লেখা, পাশের মসজিদটিকে তখন গোয়ালঘর বানানো হয়েছিল। ভাঙা গম্বুজটি ২০০২ সালে প্রত্নতাত্ত্বিক সংস্কারে পুনর্নির্মাণ করা হয় বলে জানিয়েছে জেলা তথ্য বাতায়ন। ১৯৭৫ সালে এটি সংরক্ষিত পুরাকীর্তি ঘোষিত হয়, আর ১৯৮৫ সালে বিশ্ব ঐতিহ্যের অংশ হয়; ইউনেস্কোর তালিকায় নামটি লেখা ‘জিন্দাভির’।

জিন্দাপীর আসলে কে ছিলেন, ইতিহাস তা বলতে পারে না; তবে কিংবদন্তিটি দেখায়, খানজাহানের চারপাশের মানুষেরাও কালক্রমে লোকবিশ্বাসে নিজস্ব জায়গা পেয়েছেন। মাজার কমপ্লেক্সে গেলে খানজাহানের সমাধি, পীর আলীর সমাধিবেদি, নয় গম্বুজ মসজিদ আর জিন্দাপীরের মসজিদ—সবই কাছাকাছি, হেঁটেই দেখা যায়।

গল্পের জায়গাগুলো

তথ্যসূত্র

  1. যশোহর-খুলনার ইতিহাস, প্রথম খণ্ড — সতীশচন্দ্র মিত্র · চক্রবর্তী চ্যাটার্জি অ্যান্ড কোং, কলকাতা (ইন্টারনেট আর্কাইভে সংরক্ষিত), ১৯১৪
  2. Bengal District Gazetteers: Khulna — L. S. S. O'Malley · ইন্টারনেট আর্কাইভ (মূল প্রকাশ, কলকাতা), ১৯০৮
  3. এক নজরে — বিশ্ব সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য: ঐতিহাসিক মসজিদের শহর বাগেরহাট · প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর, বাগেরহাট, ২০২৪
  4. জিন্দাপীর মসজিদ · বাগেরহাট জেলা তথ্য বাতায়ন, ২০১৯
  5. Historic Mosque City of Bagerhat (Outstanding Universal Value) · UNESCO World Heritage Centre, ১৯৮৫

কোনো তথ্য ভুল মনে হলে বা আরও ভালো সূত্র জানা থাকলে নিচে জানান; যাচাই করে ঠিক করা হবে।

বাগেরহাট সদর-এর আরও গল্প

সব দেখুন
সমাধির পাথরে লেখা শেষ কথাখানজাহানের সমাধিবেদির পাথরই তাঁর সম্পর্কে সবচেয়ে বিশ্বাসযোগ্য দলিল। সেখানে তিনি নিজেকে বলেছেন বৃদ্ধ, দুর্বল এক প্রবাসী—আর লিখে রেখেছেন মৃত্যুর তারিখ।প্রমাণিত ইতিহাসখলিফাতাবাদ: খানজাহানের পরের টাকশাল-শহর আর মোগল ‘সরকার’খানজাহানের মৃত্যুর পরও খলিফাতাবাদ হারিয়ে যায়নি। সুলতানদের মুদ্রায় এর নাম উঠেছে, মোগল রাজস্বের খাতায় এটি ছিল আস্ত এক ‘সরকার’—আর বাগেরহাটের ‘দশানী’ নামেও হয়তো লুকিয়ে আছে সেই হিসাবের ছাপ।প্রমাণিত ইতিহাসপ্রতাপাদিত্য, ফিরিঙ্গি আর মগ: বারো ভূঁইয়ার যুগে বাগেরহাটষোড়শ-সপ্তদশ শতকে যশোরের রাজা প্রতাপাদিত্যের রাজ্য ছুঁয়ে ছিল আজকের বাগেরহাট; একই সময়ে পর্তুগিজ ‘ফিরিঙ্গি’ আর আরাকানি মগ জলদস্যুর হানায় উজাড় হয়েছিল দক্ষিণের বহু জনপদ। কোনটা প্রমাণিত, কোনটা জনশ্রুতি?ইতিহাস ও জনশ্রুতিভৈরবের বাঁকে বাঁকে: নদী, হাট আর নৌপথের বাগেরহাটএকসময় বাগেরহাটে চলাফেরা মানেই ছিল নৌকা। কলকাতাগামী ধানের জাহাজ, মোড়েলগঞ্জের বন্দর, স্টিমারের হুইসেল—মরে আসা ভৈরব আর বদলে যাওয়া নদীপথের গল্প।প্রমাণিত ইতিহাস