অশ্বিনী গোঁসাইয়ের গান আর গঙ্গাচন্নার সেবাশ্রম

ইতিহাস ও জনশ্রুতিব্রিটিশ আমল১২৮৪–১৩৩৩ বঙ্গাব্দ (আনুমানিক ১৮৭৭–১৯২৬); আশ্রম ১৩৭১ বঙ্গাব্দগঙ্গাচন্না, কলাতলা ইউনিয়ন, চিতলমারী

মতুয়া সংগীতের অন্যতম প্রধান রচয়িতা অশ্বিনী গোঁসাইয়ের স্মৃতিতে চিতলমারীর গঙ্গাচন্নায় গড়ে উঠেছে একটি সেবাশ্রম। চাষি থেকে সাধক-কবি হয়ে ওঠা এই মানুষটির গান আজও ভক্তদের কণ্ঠে।

জন্ম-মৃত্যুর তারিখ, জীবনকথা ও রবীন্দ্রনাথের প্রশংসার কথা উপজেলা তথ্য বাতায়নের; রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে সাক্ষাতের কোনো স্বাধীন সূত্র পাওয়া যায়নি। গোলক পাগলের আশীর্বাদে জন্মের কথা ভক্তদের বিশ্বাস। মতুয়া সংগীতের রচয়িতা হিসেবে তাঁর নাম বাংলাপিডিয়ায় আছে।

গোপালগঞ্জের হরিচাঁদ ঠাকুর প্রবর্তিত মতুয়া সম্প্রদায়ের উপাসনার প্রধান মাধ্যম গান। বাংলাপিডিয়া জানায়, মতুয়ারা জাত-পাত বা শ্রেণির ভেদ মানেন না, নারী-পুরুষ উভয়েই ‘গোঁসাই’ বা ধর্মগুরু হতে পারেন, আর ভক্তরা দলবেঁধে কীর্তন গেয়ে উপাসনা করেন। বাউল ঢঙে লেখা মতুয়া সংগীতে হরিনামের মহিমা, হরিচাঁদ ও গুরুচাঁদ ঠাকুরের বন্দনা থাকে; ঢাক, শিঙা ও কাঁসরের মতো লোকবাদ্যের সঙ্গে নেচে নেচে গাওয়া হয়, আর গানের শেষ চরণে থাকে রচয়িতার নাম। বাংলাপিডিয়ার ‘মতুয়া সঙ্গীত’ নিবন্ধে উল্লেখযোগ্য রচয়িতাদের তালিকার প্রথম নামটিই অশ্বিনী গোঁসাই।

চিতলমারী উপজেলা তথ্য বাতায়নে অশ্বিনী গোঁসাইয়ের একটি সংক্ষিপ্ত জীবনকথা আছে। সেখানে বলা হয়েছে, ১২৮৪ বঙ্গাব্দের কার্তিক মাসে (আনুমানিক ১৮৭৭ খ্রিস্টাব্দ) কার্তিক বৈরাগীর ঘরে তাঁর জন্ম; ভক্তদের বিশ্বাস, হরিচাঁদ ঠাকুরের অন্যতম শিষ্য গোলক পাগলের আশীর্বাদেই এই জন্ম। কর্মজীবনে তিনি ছিলেন চাষি, পরে আধ্যাত্মিক সাধনায় খ্যাতি পান। মতুয়া ভক্তদের কাছে তাঁর রচিত ‘শ্রী শ্রী হরি সংগীত’ গভীর শ্রদ্ধার বস্তু; ভক্ত ও সংগীতজ্ঞদের কাছে তিনি ‘প্রেমিক কবি’ নামে পরিচিত। ১৩৩৩ বঙ্গাব্দের ৩ আষাঢ় (আনুমানিক ১৯২৬ খ্রিস্টাব্দ) তাঁর প্রয়াণ হয়। তাঁর জন্ম কোন গ্রামে, তা আমাদের পড়া সূত্রগুলোতে লেখা নেই।

বাতায়নে আরও দাবি করা হয়েছে, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর নিজে অশ্বিনী গোঁসাইকে ডেকে তাঁর গান নিয়ে আলোচনা করেছিলেন এবং প্রশংসা করেছিলেন। এই সাক্ষাতের কোনো স্বাধীন প্রমাণ বা তারিখ আমরা খুঁজে পাইনি; তাই কথাটিকে আপাতত ভক্তসমাজে প্রচলিত দাবি হিসেবেই পড়া ভালো।

চিতলমারীর কলাতলা ইউনিয়নের গঙ্গাচন্না গ্রামে প্রায় এক একর জমিতে ১৩৭১ বঙ্গাব্দে (আনুমানিক ১৯৬৪–৬৫ খ্রিস্টাব্দ) হরিদাস মণ্ডল, গঙ্গাধর ঢালী, গঙ্গাধর গাইনসহ কয়েকজন ভক্ত ‘বাংলাদেশ অশ্বিনী সেবাশ্রম’ প্রতিষ্ঠা করেন। আশ্রমে আছে অশ্বিনী গোঁসাইয়ের মূর্তি, নাটমন্দির, ভক্তদের থাকার ছয়টি ঘর ও একটি পুকুর। প্রতিবছর ২ থেকে ৪ বৈশাখ ধর্মীয় অনুষ্ঠান ও আলোচনা হয়, ভক্তদের মধ্যে প্রসাদ ও বস্ত্র বিতরণ করা হয়; শ্রাবণ মাসের শেষ মঙ্গলবার নামকীর্তনের পর বুধবার সকালে হয় গঙ্গাস্নান।

গল্পের জায়গাগুলো

তথ্যসূত্র

  1. বাংলাদেশ অশ্বিনী সেবাশ্রম · চিতলমারী উপজেলা তথ্য বাতায়ন, ২০২১
  2. মতুয়া সঙ্গীত (ওয়াকিল আহমদ) · বাংলাপিডিয়া (এশিয়াটিক সোসাইটি অব বাংলাদেশ)
  3. Matua Sangit (Wakil Ahmed) · Banglapedia (এশিয়াটিক সোসাইটি অব বাংলাদেশ)
  4. Matua (Monoranjan Ghosh) · Banglapedia (এশিয়াটিক সোসাইটি অব বাংলাদেশ)

কোনো তথ্য ভুল মনে হলে বা আরও ভালো সূত্র জানা থাকলে নিচে জানান; যাচাই করে ঠিক করা হবে।

চিতলমারী-এর আরও গল্প

সব দেখুন
নীলকুঠির পাথর থেকে বাঁধ কাটা: বাগেরহাটের কৃষক-জেলের প্রতিবাদমোড়েলগঞ্জের রহিমুল্লাহর লড়াই সবার জানা। কিন্তু চিতলমারীর নীলকুঠি, মোল্লাহাটের জেলেদের সুতার আন্দোলন আর শরণখোলার কৃষকদের বাঁধ কাটাও বাগেরহাটের প্রতিবাদের ইতিহাসের অংশ।প্রমাণিত ইতিহাসচিতল মাছের চিতলমারীজনশ্রুতি বলে, মধুমতি, চিত্রা ও বলেশ্বরের মিলনস্থলে জেলেরা এত চিতল মাছ ধরতেন যে জায়গার নামই হয়ে যায় চিতলমারী। নদীর তীরের চালের বাজার থেকে কীভাবে উপজেলা হলো, সেই গল্পও আছে।লোককথা / জনশ্রুতিদশমহলের ২০ জুন: খলিশাখালী আর হোগলাবনভারতে যাওয়ার পথে আশ্রয় নেওয়া শরণার্থীতে ভরা দশমহলে ১৯৭১ সালের ২০ জুন চার দিক থেকে গানবোট আর স্থলপথে হামলা চালায় পাকিস্তানি সেনা ও রাজাকাররা। খলিশাখালী আর খড়মখালীর হোগলাবনে প্রাণ যায় বহু মানুষের।প্রমাণিত ইতিহাসনয় মাসের মুক্তাঞ্চল চিতলমারীবাগেরহাট শহর শত্রুর দখলে গেলেও চিতলমারী একাত্তরের প্রায় পুরো সময় মুক্তাঞ্চল ছিল। বাম ও আওয়ামী রাজনীতির কর্মী, স্থানীয় বাহিনী, গ্রামের নারীরা আর এক প্রবীণ জনপ্রতিনিধি মিলে গড়েছিলেন এই প্রতিরোধ।প্রমাণিত ইতিহাস