বাংলাদেশ মুক্তিযুদ্ধ জ্ঞানকোষের চিতলমারী অধ্যায় শুরু হয়েছে এই পরিচয় দিয়ে: ব্রিটিশ আমল থেকেই চিতলমারী ছিল প্রগতিশীল বাম রাজনীতির শক্ত ঘাঁটি, পাকিস্তান আমলে এখানে ন্যাপ, কমিউনিস্ট পার্টি ও আওয়ামী লীগ সক্রিয় ছিল। সাতই মার্চের পর ন্যাপ নেতা এস এম এ সবুর, চিতলমারী আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাতা সিরাজুল হক মল্লিক, ভাসানী ন্যাপের শেখ নাসির আহমেদ, ন্যাপের শান্তিরঞ্জন গুহ এবং বড়বাড়িয়া হাইস্কুলের প্রধান শিক্ষক শামসুদ্দীন রহমান প্রমুখের নেতৃত্বে সর্বদলীয় সংগ্রাম পরিষদ গঠিত হয়।
২৭ মার্চ বাবুগঞ্জ বাজারে এক বৈঠকে এস এম এ সবুর ন্যাপ, কমিউনিস্ট পার্টি ও ছাত্র ইউনিয়নের সমর্থকদের নিয়ে একটি মুক্তিযুদ্ধ সেল গঠন করেন, যা পরে ‘সবুর বাহিনী’ নামে পরিচিত হয়। বোয়ালিয়া প্রাথমিক বিদ্যালয়ে খোলা প্রশিক্ষণ শিবিরে ৬০ জনের বেশি তরুণ প্রশিক্ষণ নেন; বড়বাড়িয়া হাইস্কুলেও একটি ক্যাম্প ছিল। গ্রামের নারী সংগঠকেরা জীবনের ঝুঁকি নিয়ে মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য খাবার জোগাড় করে পৌঁছে দিতেন। ধীরে ধীরে গড়ে ওঠে আরও কয়েকটি স্থানীয় বাহিনী: শামসু বাহিনী, হবি বাহিনী, নূর মোহাম্মদ বাহিনী, শান্তি গুহ বাহিনী। শামসু বাহিনীর প্রধান শামসুল হক মল্লিক ছিলেন পাকিস্তান বিমানবাহিনীর কর্পোরাল; মার্চে পশ্চিম পাকিস্তানের শিয়ালকোটে আটকে পড়েও কৌশলে পালিয়ে ভারত হয়ে দেশে ফেরেন।
এই প্রতিরোধের পেছনে ছিলেন এক প্রবীণ জনপ্রতিনিধিও। উপজেলা তথ্য বাতায়নের ‘প্রখ্যাত ব্যক্তিত্ব’ পাতায় শের আলী মোল্লার (১৯১৫–১৯৯৬) পরিচয় আছে: আড়ুয়াবর্নির মানুষ, শেরেবাংলা এ কে ফজলুল হকের ফুফু সামছুন্নেছার ওয়াকফ এস্টেটের ম্যানেজার, টানা ২৪ বছর চিতলমারী ইউনিয়ন বোর্ড ও পরিষদের প্রেসিডেন্ট-চেয়ারম্যান। প্রথম জীবনে তিনি জেলা পর্যায়ের মুসলিম লীগ নেতা ছিলেন, কিন্তু একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে দাঁড়ান; বাতায়নের ভাষ্য অনুযায়ী তাঁর নেতৃত্বেই চিতলমারী মুক্তাঞ্চল ঘোষিত হয়। জ্ঞানকোষ জানায়, সবুর বাহিনীর প্রধান এস এম এ সবুর ছিলেন তাঁরই ছেলে।
বাগেরহাট শহর পাকিস্তানি বাহিনীর দখলে চলে গেলেও জ্ঞানকোষ অনুযায়ী চিতলমারী যুদ্ধের পুরো নয় মাস, জুনের ১৭, ১৮ ও ২০ তারিখের হামলা ছাড়া, মুক্তাঞ্চল ছিল; এখানে পাকিস্তানি সেনাদের কোনো ক্যাম্প ছিল না। চিতলমারীর মুক্তিযোদ্ধারা খুলনার গল্লামারী, মোল্লাহাটের চরকুলিয়া ও হাড়িদহ সেতু, দত্তডাঙ্গা রাজাকার ক্যাম্পসহ নানা জায়গায় লড়েছেন; গল্লামারীর যুদ্ধে শহীদ হন আড়ুয়াবর্নির জয়নুল আবেদিন মানিক মিয়া।
১৯৯৭ সালে সন্তোষপুর মুক্তিযোদ্ধা কল্যাণ পরিষদের উদ্যোগে চিতলমারী সদর থেকে সাত কিলোমিটার দক্ষিণে সন্তোষপুর হাইস্কুল মাঠের পাশে শহীদদের স্মৃতিসৌধ নির্মিত হয়। স্বাধীনতার পর আরেকটি ছোট কিন্তু অর্থবহ বদল ঘটে কলাতলা ইউনিয়নে: পাকিস্তান আমলে সেখানকার একটি খাল আর তার পাড়ের হাটের নাম ছিল ‘পাকিস্তানের খাল’ ও ‘পাকিস্তানের হাট’; স্বাধীনতার পর নাম বদলে রাখা হয় ‘বাংলাবাজার খাল’ ও ‘বাংলাবাজার হাট’।