নীলকুঠির পাথর থেকে বাঁধ কাটা: বাগেরহাটের কৃষক-জেলের প্রতিবাদ

প্রমাণিত ইতিহাসব্রিটিশ আমলউনিশ শতক থেকে ১৯৬৯হিজলা (চিতলমারী), মোল্লাহাট, শরণখোলা

মোড়েলগঞ্জের রহিমুল্লাহর লড়াই সবার জানা। কিন্তু চিতলমারীর নীলকুঠি, মোল্লাহাটের জেলেদের সুতার আন্দোলন আর শরণখোলার কৃষকদের বাঁধ কাটাও বাগেরহাটের প্রতিবাদের ইতিহাসের অংশ।

প্রতিটি ঘটনার উৎস বাংলাপিডিয়ার সংশ্লিষ্ট উপজেলা ভুক্তি; এগুলো সংক্ষিপ্ত বিবরণ, নাম-তারিখের বিস্তার পাওয়া যায়নি। রফিক বাহিনীর সঙ্গে কৃষক সমিতির যোগ দ্য ডেইলি স্টারের প্রতিবেদনভিত্তিক।

বাগেরহাটে কৃষক-প্রতিবাদের সবচেয়ে পরিচিত নাম রহিমুল্লাহ। বাংলাপিডিয়া জানায়, মোড়েলগঞ্জের নীলকুঠির অত্যাচারের বিরুদ্ধে বারইখালীর রহিমুল্লাহর নেতৃত্বে প্রতিরোধ গড়ে ওঠে, আর ১৮৬১ সালের নভেম্বরে তিনি নিহত হন (তাঁর গল্প মোড়েলগঞ্জ পর্বে আলাদা করে বলা হয়েছে)। বাংলাপিডিয়ায় রহিমুল্লাহর মৃত্যুর তারিখ ২৫ নভেম্বর, আর জেলা তথ্য বাতায়ন সংঘর্ষের তারিখ লিখেছে ২৬ নভেম্বর। কিন্তু জেলার অন্য প্রান্তেও এমন প্রতিবাদের চিহ্ন আছে, যদিও সেগুলোর বিবরণ এখনো ছেঁড়া-ছেঁড়া।

চিতলমারীর হিজলা ইউনিয়নে ছিল একটি ইংরেজ নীলকুঠি। বাংলাপিডিয়ার চিতলমারী উপজেলা ভুক্তিতে লেখা আছে, সেখানে নীল-বিদ্রোহী চাষিদের শাস্তি দেওয়া হতো বুকের ওপর ভারী পাথর চাপা দিয়ে। কুঠিটি কে চালাতেন, কবে এ নির্যাতন চলেছিল, তার তারিখ বা নাম আমরা খুঁজে পাইনি; তবে উদাহরণটি দেখায়, নীলচাষের বিরুদ্ধে ক্ষোভ মোড়েলগঞ্জেই সীমাবদ্ধ ছিল না।

বিশ শতকের প্রতিবাদ এসেছে জেলেদের কাছ থেকে। বাংলাপিডিয়ার মোল্লাহাট ভুক্তি অনুযায়ী, ১৯৪৩–৪৪ সালে কালোবাজারি ও অন্যান্য কারণে মাছ ধরার জাল বোনার সুতা বাজার থেকে প্রায় উধাও হয়ে যায়। কৃত্রিম এই সংকটে জেলেরা কাজ হারান, আর কৃষক সমিতির নেতৃত্বে তাঁরা আন্দোলনে নামেন।

পাকিস্তান আমলের সবচেয়ে নাটকীয় ঘটনাটি শরণখোলার। বাংলাপিডিয়া জানায়, ১৯৬৫ সালে লবণপানি ঠেকাতে নদীর পাড়ে বেড়িবাঁধ দেওয়া হয় এবং খালের মুখ বন্ধ করে দেওয়া হয়। এতে পানি নামার পথ বন্ধ হয়ে জলাবদ্ধতা দেখা দেয়, ফসলের ব্যাপক ক্ষতি হয়। সরকারের কাছে আবেদন-নিবেদনে সাড়া না পেয়ে ১৯৬৯ সালের ১০ মার্চ কৃষকেরা একযোগে রায়েন্দা, তাফালবাড়ি, খোন্তাকাটা ও কুমারখালী খালের বাঁধ কেটে দেন।

এই ধারার সঙ্গে একাত্তরেরও যোগ আছে। দ্য ডেইলি স্টারের প্রতিবেদন অনুযায়ী, মুক্তিযুদ্ধে বিষ্ণুপুরে গড়ে ওঠা রফিক বাহিনীর কয়েকজন সদস্য আগে থেকেই কৃষক সমিতির রাজনীতির সূত্রে এলাকায় পরিচিত ছিলেন। হিজলার নীলকুঠি বা মোল্লাহাটের জেলে আন্দোলনের পূর্ণ বিবরণ উদ্ধারে স্থানীয় স্মৃতি ও নথি সংগ্রহ এখনো জরুরি।

তথ্যসূত্র

  1. চিতলমারী উপজেলা · বাংলাপিডিয়া, ২০২১
  2. মোল্লাহাট উপজেলা · বাংলাপিডিয়া, ২০২১
  3. শরণখোলা উপজেলা · বাংলাপিডিয়া, ২০২১
  4. Morrelganj Upazila · বাংলাপিডিয়া (ইংরেজি), ২০২১
  5. মুক্তিযুদ্ধে বাগেরহাটের রফিক বাহিনী (আহমাদ ইশতিয়াক) · দ্য ডেইলি স্টার বাংলা, ২০২৪
  6. বাগেরহাট জেলার পটভূমি · বাগেরহাট জেলা তথ্য বাতায়ন (জেলা প্রশাসন), ২০১৪

কোনো তথ্য ভুল মনে হলে বা আরও ভালো সূত্র জানা থাকলে নিচে জানান; যাচাই করে ঠিক করা হবে।

চিতলমারী-এর আরও গল্প

সব দেখুন
চিতল মাছের চিতলমারীজনশ্রুতি বলে, মধুমতি, চিত্রা ও বলেশ্বরের মিলনস্থলে জেলেরা এত চিতল মাছ ধরতেন যে জায়গার নামই হয়ে যায় চিতলমারী। নদীর তীরের চালের বাজার থেকে কীভাবে উপজেলা হলো, সেই গল্পও আছে।লোককথা / জনশ্রুতিঅশ্বিনী গোঁসাইয়ের গান আর গঙ্গাচন্নার সেবাশ্রমমতুয়া সংগীতের অন্যতম প্রধান রচয়িতা অশ্বিনী গোঁসাইয়ের স্মৃতিতে চিতলমারীর গঙ্গাচন্নায় গড়ে উঠেছে একটি সেবাশ্রম। চাষি থেকে সাধক-কবি হয়ে ওঠা এই মানুষটির গান আজও ভক্তদের কণ্ঠে।ইতিহাস ও জনশ্রুতিদশমহলের ২০ জুন: খলিশাখালী আর হোগলাবনভারতে যাওয়ার পথে আশ্রয় নেওয়া শরণার্থীতে ভরা দশমহলে ১৯৭১ সালের ২০ জুন চার দিক থেকে গানবোট আর স্থলপথে হামলা চালায় পাকিস্তানি সেনা ও রাজাকাররা। খলিশাখালী আর খড়মখালীর হোগলাবনে প্রাণ যায় বহু মানুষের।প্রমাণিত ইতিহাসনয় মাসের মুক্তাঞ্চল চিতলমারীবাগেরহাট শহর শত্রুর দখলে গেলেও চিতলমারী একাত্তরের প্রায় পুরো সময় মুক্তাঞ্চল ছিল। বাম ও আওয়ামী রাজনীতির কর্মী, স্থানীয় বাহিনী, গ্রামের নারীরা আর এক প্রবীণ জনপ্রতিনিধি মিলে গড়েছিলেন এই প্রতিরোধ।প্রমাণিত ইতিহাস