দশমহলের ২০ জুন: খলিশাখালী আর হোগলাবন

প্রমাণিত ইতিহাসমুক্তিযুদ্ধ ১৯৭১২০ জুন ১৯৭১ (৫ আষাঢ় ১৩৭৮)খলিশাখালী, খড়মখালী, পিপড়াডাঙ্গা ও দশমহল এলাকা, চিতলমারী

ভারতে যাওয়ার পথে আশ্রয় নেওয়া শরণার্থীতে ভরা দশমহলে ১৯৭১ সালের ২০ জুন চার দিক থেকে গানবোট আর স্থলপথে হামলা চালায় পাকিস্তানি সেনা ও রাজাকাররা। খলিশাখালী আর খড়মখালীর হোগলাবনে প্রাণ যায় বহু মানুষের।

ঘটনাটি প্রামাণ্য ইতিহাস, তবে নিহতের সংখ্যা ও বাংলাপিডিয়ার একটি তারিখ অন্য সূত্রের সঙ্গে মেলে না; ভিন্ন হিসাবগুলো গল্পে উল্লেখ করা হয়েছে। কোনো আদালতে দণ্ডিত ব্যক্তির তথ্য না পাওয়ায় কারও নাম লেখা হয়নি।

চিতলমারীর হিন্দুপ্রধান কয়েকটি গ্রাম মিলে একটি বড় এলাকা স্থানীয়ভাবে ‘দশমহল’ নামে পরিচিত। একাত্তরে জায়গাটি ছিল বাগেরহাট, কচুয়া ও মোল্লাহাট থানার সীমান্তে। যুদ্ধ শুরুর পর পিরোজপুরের স্বরূপকাঠির আটঘর-কুড়িয়ানা পেয়ারাবাগান অঞ্চল থেকে শত শত মানুষ ভারতে যাওয়ার পথে দশমহলের গ্রামগুলোতে আশ্রয় নিয়েছিলেন। অনেকে এক-দুদিন বিশ্রাম নিয়ে আবার পথে নামার অপেক্ষায় ছিলেন।

১৯৭১ সালের ২০ জুন, রোববার (৫ আষাঢ় ১৩৭৮), বাগেরহাটের পাকিস্তানি বাহিনী খুলনা, পিরোজপুর ও গোপালগঞ্জের বাহিনীর সঙ্গে মিলে এলাকাটিতে একযোগে হামলা চালায়। মুক্তিযুদ্ধ কোষ ও মুক্তিযুদ্ধ জ্ঞানকোষের বিবরণ অনুযায়ী, হুলারহাট থেকে একটি গানবোট এসে ভেড়ে দশমহলের পূর্ব সীমান্তের বাবুগঞ্জ বাজারে, পিরোজপুর থেকে আরেকটি আসে দক্ষিণ-পূর্বের কালীগঞ্জ বাজারে, গোপালগঞ্জ থেকে একটি আসে উত্তরের বড়গুনিতে, আর বাগেরহাট থেকে একটি গানবোট আসে গোদাড়াঘাট পর্যন্ত। স্থলপথে আরেকটি দল মুনিগঞ্জ, কান্দাপাড়া, দেপাড়া ও সন্তোষপুর হয়ে চিতলমারীর দিকে এগোয়। স্পিডবোট থেকে গ্রামের দিকে গুলি আর মর্টার ছোড়া হয়; প্রতিটি দলের সঙ্গে ছিল স্থানীয় ও বহিরাগত রাজাকার ও দালাল, যারা লুটপাট আর অগ্নিসংযোগে অংশ নেয়।

বাবুগঞ্জ থেকে চিতলমারীর দিকে যাওয়া দলটি খলিশাখালী গ্রামের ভেতর দিয়ে এগোয়। পাট আর ধানখেতে লুকিয়ে থাকা শরণার্থীদের খুঁজে খুঁজে গুলি করা হয়। জ্ঞানকোষ বলছে, খলিশাখালীতে শতাধিক মানুষ নিহত হন, যাঁদের বেশির ভাগ বাইরে থেকে আসা আশ্রয়প্রার্থী হওয়ায় পরিচয় জানা যায়নি; খলিশাখালী গ্রামেরই ১১ জনের নাম পাওয়া গেছে। মুক্তিযুদ্ধ কোষে খলিশাখালীর ‘ডাঙা’য় নিহতের সংখ্যা প্রায় ৫০ বলা হয়েছে। কালীগঞ্জ থেকে এগোনো দলটি পিপড়াডাঙ্গা হয়ে খাসেরহাটের পথে বহু হিন্দুবাড়িতে আগুন দেয়, কয়েকজনকে গুলি করে হত্যা করে এবং নারীদের ওপর নির্যাতন চালায়।

সবচেয়ে বড় হত্যাকাণ্ডটি ঘটে খড়মখালীতে। খড়মখালী-গরীবপুর খালের উত্তরে, এখনকার শেরেবাংলা কলেজের কাছে বিস্তীর্ণ হোগলাবনে লুকিয়ে ছিলেন আটঘর-কুড়িয়ানার বহু মানুষ। চার দিক থেকে দশমহল ঘিরে ফেলা সেনারা হোগলাবনে মানুষের উপস্থিতি টের পেয়ে নির্বিচারে গুলি চালায়। জ্ঞানকোষের এক খণ্ডে এখানে নিহতের সংখ্যা দুই শতাধিক, আরেক খণ্ডে ৭০–৮০ জন বলা হয়েছে। নিহতদের বেশির ভাগের লাশ উদ্ধার বা সৎকার হয়নি।

চিতলমারীতে তিনটি গণকবর চিহ্নিত: খলিশাখালীর মাঠ, পিপড়াডাঙ্গার মাঠ আর খড়মখালীর হোগলাবন। বাংলাপিডিয়ার চিতলমারী নিবন্ধে খলিশাখালী ও বাবুগঞ্জ বাজারে প্রায় ২০০ জন হত্যার কথা আছে, তবে বাগেরহাট জেলা নিবন্ধে এর তারিখ লেখা হয়েছে ২১ এপ্রিল, যা অন্য বিবরণের সঙ্গে মেলে না। শহীদদের স্মরণে চিতলমারীর সন্তোষপুরে একটি স্মৃতিসৌধ রয়েছে।

তথ্যসূত্র

  1. খলিশাখালী গণহত্যা (চিতলমারী, বাগেরহাট) · সংগ্রামের নোটবুক (মূল সূত্র: বাংলাদেশ মুক্তিযুদ্ধ জ্ঞানকোষ, ২য় খণ্ড)
  2. খড়মখালী-হোগলাবন গণহত্যা (চিতলমারী, বাগেরহাট) · সংগ্রামের নোটবুক (মূল সূত্র: বাংলাদেশ মুক্তিযুদ্ধ জ্ঞানকোষ, ২য় খণ্ড)
  3. মুক্তিযুদ্ধে চিতলমারী উপজেলা (বাগেরহাট) · সংগ্রামের নোটবুক (মূল সূত্র: বাংলাদেশ মুক্তিযুদ্ধ জ্ঞানকোষ, ৩য় খণ্ড)
  4. চিতলমারী ও দশমহলের গণহত্যা · সংগ্রামের নোটবুক (মূল সূত্র: মুক্তিযুদ্ধ কোষ, ২য় খণ্ড, সম্পা. মুনতাসীর মামুন)
  5. খলিশাখালীর ডাঙা গণহত্যা · সংগ্রামের নোটবুক (মূল সূত্র: মুক্তিযুদ্ধ কোষ, ২য় খণ্ড, সম্পা. মুনতাসীর মামুন)
  6. Chitalmari Upazila · Banglapedia (এশিয়াটিক সোসাইটি অব বাংলাদেশ)
  7. বাগেরহাট জেলা · বাংলাপিডিয়া (এশিয়াটিক সোসাইটি অব বাংলাদেশ)

কোনো তথ্য ভুল মনে হলে বা আরও ভালো সূত্র জানা থাকলে নিচে জানান; যাচাই করে ঠিক করা হবে।

চিতলমারী-এর আরও গল্প

সব দেখুন
নীলকুঠির পাথর থেকে বাঁধ কাটা: বাগেরহাটের কৃষক-জেলের প্রতিবাদমোড়েলগঞ্জের রহিমুল্লাহর লড়াই সবার জানা। কিন্তু চিতলমারীর নীলকুঠি, মোল্লাহাটের জেলেদের সুতার আন্দোলন আর শরণখোলার কৃষকদের বাঁধ কাটাও বাগেরহাটের প্রতিবাদের ইতিহাসের অংশ।প্রমাণিত ইতিহাসচিতল মাছের চিতলমারীজনশ্রুতি বলে, মধুমতি, চিত্রা ও বলেশ্বরের মিলনস্থলে জেলেরা এত চিতল মাছ ধরতেন যে জায়গার নামই হয়ে যায় চিতলমারী। নদীর তীরের চালের বাজার থেকে কীভাবে উপজেলা হলো, সেই গল্পও আছে।লোককথা / জনশ্রুতিঅশ্বিনী গোঁসাইয়ের গান আর গঙ্গাচন্নার সেবাশ্রমমতুয়া সংগীতের অন্যতম প্রধান রচয়িতা অশ্বিনী গোঁসাইয়ের স্মৃতিতে চিতলমারীর গঙ্গাচন্নায় গড়ে উঠেছে একটি সেবাশ্রম। চাষি থেকে সাধক-কবি হয়ে ওঠা এই মানুষটির গান আজও ভক্তদের কণ্ঠে।ইতিহাস ও জনশ্রুতিনয় মাসের মুক্তাঞ্চল চিতলমারীবাগেরহাট শহর শত্রুর দখলে গেলেও চিতলমারী একাত্তরের প্রায় পুরো সময় মুক্তাঞ্চল ছিল। বাম ও আওয়ামী রাজনীতির কর্মী, স্থানীয় বাহিনী, গ্রামের নারীরা আর এক প্রবীণ জনপ্রতিনিধি মিলে গড়েছিলেন এই প্রতিরোধ।প্রমাণিত ইতিহাস