চিতল মাছের চিতলমারী

লোককথা / জনশ্রুতিব্রিটিশ আমলজনপদের সূচনা উনিশ শতকের সত্তরের দশকে (উপজেলা বাতায়ন)চিতলমারী সদর, মধুমতি নদীর তীর

জনশ্রুতি বলে, মধুমতি, চিত্রা ও বলেশ্বরের মিলনস্থলে জেলেরা এত চিতল মাছ ধরতেন যে জায়গার নামই হয়ে যায় চিতলমারী। নদীর তীরের চালের বাজার থেকে কীভাবে উপজেলা হলো, সেই গল্পও আছে।

চিতল মাছ থেকে নামকরণের কথাটি জনশ্রুতি; উপজেলা বাতায়ন নিজেই বলেছে নামের উৎস নিশ্চিত নয়। থানা ও উপজেলা গঠনের সাল প্রশাসনিক তথ্য।

চিতলমারী নামটা শুনলেই মাছের কথা মনে আসে, আর স্থানীয় জনশ্রুতিও সেদিকেই ইঙ্গিত করে। চিতলমারী উপজেলা তথ্য বাতায়ন স্পষ্ট করেই লিখেছে, নামকরণ নিয়ে সঠিক কিছু বলা সম্ভব নয়। তবে লোকমুখে প্রচলিত, জায়গাটি মধুমতি, চিত্রা ও বলেশ্বর নদীর সঙ্গমস্থলের তীরে। সেই মোহনা একসময় চিতল মাছের জন্য বিখ্যাত ছিল, জেলেরা সেখানে প্রচুর চিতল ধরতেন। সেখান থেকেই স্থানীয় মানুষ তীরের জনপদটিকে ডাকতে শুরু করেন চিতলমারী নামে।

উপজেলা বাতায়নের ইতিহাস অনুযায়ী, উনিশ শতকের সত্তরের দশকের দিকে মধুমতির তীরে এখানে জনবসতি জমে ওঠে এবং একটি ছোট ব্যবসাকেন্দ্র গড়ে ওঠে; এখান থেকে চাল রপ্তানি হতো। দীর্ঘদিন চিতলমারী ছিল বাগেরহাট থানার অধীন একটি ইউনিয়ন। এলাকার গুরুত্ব বাড়ায় ১৯৮১ সালে বাগেরহাট সদর, কচুয়া ও মোল্লাহাটের অংশ নিয়ে চিতলমারী থানা গঠিত হয়, আর ১৯৮৩ সালের ৭ নভেম্বর থানাটি উপজেলায় উন্নীত হয়। প্রথম উপজেলা নির্বাহী অফিসার ছিলেন নুরুল হুদা চৌধুরী; ১৯৮৫ সালের নির্বাচনে প্রথম উপজেলা চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন কালিদাস বড়াল।

প্রশাসনিক ইতিহাসের বিবরণে অবশ্য কিছু ভিন্নতা আছে। বাংলা উইকিপিডিয়ায় বলা হয়েছে, মোল্লাহাট থানার অংশ নিয়ে চিতলমারী থানা হয়েছিল; আবার একাত্তরের বিবরণগুলোতে চিতলমারীকে কখনো বাগেরহাট, কখনো কচুয়া থানার অংশ হিসেবে দেখানো হয়েছে। তিন থানার সীমান্তে থাকা এই জনপদের প্রশাসনিক পরিচয় তাই সময়ের সঙ্গে বদলেছে। উপজেলা বাতায়নের হিসাবে চিতলমারীর আয়তন ১৯২ বর্গকিলোমিটার; উত্তরে মধুমতি নদী, দক্ষিণে কচুয়া ও বাগেরহাট সদর, পূর্বে পিরোজপুরের নাজিরপুর আর পশ্চিমে মোল্লাহাট ও ফকিরহাট। যে নদীর নামে জনশ্রুতির শুরু, সেই মধুমতি আজও উপজেলার উত্তর সীমানা জুড়ে বয়ে চলেছে।

চিতল মাছ আর নামের সম্পর্ক নিয়ে কোনো লিখিত দলিল পাওয়া যায় না; গল্পটি জনশ্রুতি। তবে একটি জায়গার নাম যে তার নদী আর মাছ ধরার জীবন থেকে উঠে আসতে পারে, চিতলমারীর মানুষ সেই গল্পই প্রজন্ম ধরে বলে আসছেন।

তথ্যসূত্র

  1. চিতলমারী উপজেলার পটভূমি · চিতলমারী উপজেলা তথ্য বাতায়ন, ২০২৬
  2. চিতলমারী উপজেলা · উইকিপিডিয়া (বাংলা)
  3. চিতলমারী উপজেলা · বাংলাপিডিয়া (এশিয়াটিক সোসাইটি অব বাংলাদেশ)
  4. চিতলমারী ও দশমহলের গণহত্যা · সংগ্রামের নোটবুক (মূল সূত্র: মুক্তিযুদ্ধ কোষ, ২য় খণ্ড, সম্পা. মুনতাসীর মামুন)
  5. চিতলমারি বধ্যভূমি · সংগ্রামের নোটবুক (মূল সূত্র: মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর সংগৃহীত তথ্য; একাত্তরের বাগেরহাট)

কোনো তথ্য ভুল মনে হলে বা আরও ভালো সূত্র জানা থাকলে নিচে জানান; যাচাই করে ঠিক করা হবে।

চিতলমারী-এর আরও গল্প

সব দেখুন
নীলকুঠির পাথর থেকে বাঁধ কাটা: বাগেরহাটের কৃষক-জেলের প্রতিবাদমোড়েলগঞ্জের রহিমুল্লাহর লড়াই সবার জানা। কিন্তু চিতলমারীর নীলকুঠি, মোল্লাহাটের জেলেদের সুতার আন্দোলন আর শরণখোলার কৃষকদের বাঁধ কাটাও বাগেরহাটের প্রতিবাদের ইতিহাসের অংশ।প্রমাণিত ইতিহাসঅশ্বিনী গোঁসাইয়ের গান আর গঙ্গাচন্নার সেবাশ্রমমতুয়া সংগীতের অন্যতম প্রধান রচয়িতা অশ্বিনী গোঁসাইয়ের স্মৃতিতে চিতলমারীর গঙ্গাচন্নায় গড়ে উঠেছে একটি সেবাশ্রম। চাষি থেকে সাধক-কবি হয়ে ওঠা এই মানুষটির গান আজও ভক্তদের কণ্ঠে।ইতিহাস ও জনশ্রুতিদশমহলের ২০ জুন: খলিশাখালী আর হোগলাবনভারতে যাওয়ার পথে আশ্রয় নেওয়া শরণার্থীতে ভরা দশমহলে ১৯৭১ সালের ২০ জুন চার দিক থেকে গানবোট আর স্থলপথে হামলা চালায় পাকিস্তানি সেনা ও রাজাকাররা। খলিশাখালী আর খড়মখালীর হোগলাবনে প্রাণ যায় বহু মানুষের।প্রমাণিত ইতিহাসনয় মাসের মুক্তাঞ্চল চিতলমারীবাগেরহাট শহর শত্রুর দখলে গেলেও চিতলমারী একাত্তরের প্রায় পুরো সময় মুক্তাঞ্চল ছিল। বাম ও আওয়ামী রাজনীতির কর্মী, স্থানীয় বাহিনী, গ্রামের নারীরা আর এক প্রবীণ জনপ্রতিনিধি মিলে গড়েছিলেন এই প্রতিরোধ।প্রমাণিত ইতিহাস