ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট বঙ্কিমচন্দ্র ও মোরেলগঞ্জ মামলা

প্রমাণিত ইতিহাসব্রিটিশ আমল১৮৬১ সাল ও পরবর্তী কয়েক বছরমোরেলগঞ্জ ও বারইখালী

বারইখালীর হত্যাকাণ্ডের তদন্তে নৌকায় মোরেলগঞ্জে ছুটে গিয়েছিলেন খুলনার তরুণ মহকুমা ম্যাজিস্ট্রেট বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়। লাখ টাকার ঘুষের প্রস্তাব ফিরিয়ে দেওয়া, বৃন্দাবন ও বোম্বাই থেকে আসামি ধরা, আর শেষে হেলির খালাস—মামলার আদ্যোপান্ত।

তদন্ত, ওয়ারেন্ট, আসামিদের পলায়ন ও গ্রেপ্তার এবং সাজার বিবরণ সতীশচন্দ্র মিত্রের ইতিহাসগ্রন্থ ও তাঁর উদ্ধৃত ‘বঙ্কিম-জীবনী’ থেকে; ঘুষের প্রস্তাবের কথা এস. কে. বসুর জীবনীতেও আছে, তবে সেখানে ‘গল্প আছে’ বলে উল্লেখিত। হেলির বজ্রপাতে মৃত্যুর কথা লোকশ্রুতি। মূল আদালত-নথি দেখা সম্ভব হয়নি।

১৮৬১ সালে খুলনা ছিল যশোর জেলার একটি মহকুমা। সেখানকার মহকুমা ম্যাজিস্ট্রেটের দায়িত্বে ছিলেন তেইশ-চব্বিশ বছরের এক ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট—বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, পরে যিনি বাংলা উপন্যাসের পথিকৃৎ হিসেবে খ্যাতি পান। সতীশচন্দ্র মিত্রের হিসাবে তিনি ১৮৬০ সালের নভেম্বর থেকে ১৮৬৪ সালের মার্চ পর্যন্ত খুলনায় ছিলেন। নদীপথে জলদস্যুদের ডাকাতি দমনে তাঁর কড়া হাতের কথা তখন সবার মুখে; মিত্র লিখেছেন, খুলনায় বসেই তিনি প্রথম উপন্যাস ‘দুর্গেশনন্দিনী’র পাণ্ডুলিপি তৈরি করেন।

বারইখালীতে যেদিন রহিমুল্লাহ নিহত হন, বঙ্কিমচন্দ্র তখন ফকিরহাট থানায়। দুই দিন পর সেখানেই খুনের এজাহার পৌঁছায়। তিনি সঙ্গে সঙ্গে যশোর থেকে ৫০ জন সিপাহি পাঠানোর অনুরোধ জানিয়ে অল্প কয়েকজন পুলিশ নিয়ে নৌকায় মোরেলগঞ্জের পথে রওনা দেন। সেখানে পৌঁছে দাঙ্গার জায়গা আর পরদিন সাহেবদের কুঠি ঘুরে দেখেন, কিন্তু সিপাহি না আসা পর্যন্ত কাউকে কিছু বুঝতে দেননি। গুপ্তচরের মুখে সিপাহি আসার খবর পেয়ে মোরেল, হেলি ও প্রধান কর্মচারীরা রাতের অন্ধকারে সরে পড়েন; যাঁরা থেকে গিয়েছিলেন, তাঁদের গ্রেপ্তার করে খুলনায় নেওয়া হয়।

দীর্ঘ তদন্ত শেষে বঙ্কিমচন্দ্র কড়া মন্তব্যসহ বিশদ প্রতিবেদন পাঠান, হেলিসহ আসামিদের নামে ওয়ারেন্ট জারি করেন এবং ধরিয়ে দেওয়ার জন্য পুরস্কার ঘোষণা করেন। মিত্রের বিবরণে, মোরেলদের এক প্রধান কর্মচারী দুর্গাচরণ সাহা ‘রাধামাধব দাস’ নাম নিয়ে বৃন্দাবনে লুকিয়ে ছিলেন—ওয়ারেন্ট সেখানে পৌঁছে তাঁকে ধরে আনে। হেলি ছদ্মনামে বোম্বাই হয়ে পালানোর চেষ্টা করছিলেন, পুলিশ সেখান থেকেই তাঁকে ধরে আনে। তদন্ত চলার সময় সাহেবপক্ষ বঙ্কিমকে লাখ টাকা ঘুষ দিতে চেয়েছিল, রাজি না হলে প্রাণনাশের চেষ্টাও হয়েছিল বলে মিত্র লিখেছেন। ভারত সরকারের প্রকাশনা বিভাগের বঙ্কিম-জীবনীতেও (এস. কে. বসু, ১৯৭৪) মোটা ঘুষের প্রস্তাব ও প্রাণনাশের ষড়যন্ত্রের কথা ‘শোনা যায়’ বলে উল্লেখ আছে।

তদন্তকারী হওয়ায় বঙ্কিমচন্দ্র নিজে মামলার বিচার করেননি। মিত্রের বর্ণনায়, যশোরের দায়রা আদালতে একজনের ফাঁসি এবং ৩৪ জন আসামির যাবজ্জীবন দ্বীপান্তরের সাজা হয়; দুর্গাচরণের হয় কয়েক বছরের জেল। হেলিসহ ইউরোপীয় আসামিদের বিচার হয় হাইকোর্টের দায়রায়; কিন্তু কেউ হেলিকে শনাক্ত করতে না পারায় তিনি খালাস পান। লোকমুখে শোনা যায়, কয়েক বছর পর আসামে বজ্রপাতে তাঁর মৃত্যু হয়। রবার্ট মোরেল ঘটনার সময় বরিশালে ছিলেন বলে আসামি হননি; হেনরি মোরেল বিলেতে পালিয়ে যান এবং কয়েক বছর পর ফেরার পথে মারা যান।

মিত্রের ভাষ্যে মামলাটি প্রায় ১৪-১৫ বছর গড়িয়েছিল, তাতে মোরেলদের বিপুল অর্থ ও সম্মানহানি হয়—আর এই ঘটনাই তাঁদের পতনের পথ খুলে দেয়। দাঙ্গার পর রবার্ট মোরেল হেলিকে বরখাস্ত করে লাইটফুট নামের একজনকে ম্যানেজার করেন। সূত্রগুলোর মধ্যে কিছু অমিলও আছে: বসুর বইয়ে লাইটফুটকে মোরেলের অংশীদার হিসেবে ওয়ারেন্টভুক্তদের মধ্যে দেখানো হয়েছে, আর প্রজাদের খাজনা বৃদ্ধি ও নীলচাষে অস্বীকৃতিকে বিরোধের কারণ বলা হয়েছে—যদিও মিত্র স্পষ্ট লিখেছেন, মোরেলগঞ্জে নীলচাষ ছিল না। মূল আদালত-নথি অনলাইনে পাওয়া যায়নি; সাজার বিবরণ মূলত মিত্রের বই এবং তাঁর উল্লেখ করা শচীশচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের ‘বঙ্কিম-জীবনী’ থেকে এসেছে।

গল্পের জায়গাগুলো

তথ্যসূত্র

  1. যশোহর-খুলনার ইতিহাস, দ্বিতীয় খণ্ড (‘রেণী ও মরেল-কাহিনী’ অধ্যায়, পৃ. ৭৯৮–৮০৭) · সতীশচন্দ্র মিত্র; ইন্টারনেট আর্কাইভে সংরক্ষিত দ্বিতীয় সংস্করণ, ১৯৬৫
  2. Bankim Chandra Chatterji (Builders of Modern India), chapter ‘The Administrator’ · S. K. Bose, Publications Division, Government of India, ১৯৭৪
  3. ভারতের কৃষক-বিদ্রোহ ও গণতান্ত্রিক সংগ্রাম (তৃতীয় সংস্করণ), সুন্দরবন অঞ্চলের বিদ্রোহ ও বারুইখালির সংগ্রাম অংশ · সুপ্রকাশ রায়; ইন্টারনেট আর্কাইভ
  4. মোড়েলগঞ্জ উপজেলা · বাংলাপিডিয়া, বাংলাদেশ এশিয়াটিক সোসাইটি

কোনো তথ্য ভুল মনে হলে বা আরও ভালো সূত্র জানা থাকলে নিচে জানান; যাচাই করে ঠিক করা হবে।

মোরেলগঞ্জ-এর আরও গল্প

সব দেখুন
বন কেটে আবাদ: বাঘ, নলখাগড়া আর ঝড়ের সঙ্গে লড়াইদেড় শ বছর আগে মোরেলগঞ্জ-শরণখোলার মাটি ছিল ঘন সুন্দরবন। লোহার খাঁচায় বসে মানুষখেকো বাঘ শিকার, এক বছর অবহেলায় ফিরে আসা নলবন আর ১৮৬৯ সালের ঝড়—সমকালীন সরকারি প্রতিবেদনে আবাদের কঠিন দিনগুলোর ছবি।প্রমাণিত ইতিহাসসরালিয়া থেকে মোরেলগঞ্জ: এক ইংরেজ পরিবারের আবাদ ও নামকরণপানগুছির পাড়ের গ্রামটির নাম ছিল সরালিয়া। ১৮৪৯ সালে এক ইংরেজ নারী ছেলেদের নামে সুন্দরবনের লাট বন্দোবস্ত নেওয়ার পর জঙ্গল কেটে গড়ে ওঠে বাজার—নাম হয় মোরেলগঞ্জ। আর ‘নীলকুঠি’ নিয়ে প্রচলিত ধারণা কতটা ঠিক?প্রমাণিত ইতিহাসবারইখালীর রহিমুল্লাহ: মোরেলদের লাঠিয়ালের বিরুদ্ধে এক রাতের লড়াই১৮৬১ সালের নভেম্বরে বারইখালীর কৃষক রহিমুল্লাহ মোরেল জমিদারির ম্যানেজার ডেনিস হেলির লাঠিয়াল-বন্দুকধারীদের বিরুদ্ধে সারা রাত লড়ে প্রাণ দেন। দক্ষিণ বাংলার কৃষক-প্রতিরোধের এই অধ্যায় নিয়ে যা দলিলে আছে, আর যা কেবল লোকমুখে।প্রমাণিত ইতিহাসবন্দরের স্বপ্ন থেকে ‘ছোট কলকাতা’: মোরেলগঞ্জের হাট, জাহাজ আর জমিদারি বদলএক ইংরেজ কর্মকর্তা ভেবেছিলেন, মোরেলগঞ্জ একদিন হবে সুন্দরবনের ‘বাণিজ্যিক রাজধানী’। ১৮৬৯ সালে বন্দর ঘোষণা, হাটবারে নৌকার ভিড়, মিঠা পানির শেষ ঘাট—তারপর মোরেলদের জমিদারি হাতবদল আর পানগুছির ভাঙন।প্রমাণিত ইতিহাস