সীমানা-বিরোধ, হেলির হামলা, রাতভর লড়াই, রহিমুল্লাহর মৃত্যু ও ১৭ জন নিহত হওয়ার বিবরণ সতীশচন্দ্র মিত্রের ইতিহাসগ্রন্থে লিপিবদ্ধ; তিনি স্থানীয় অনুসন্ধান ও বাবার প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে লিখেছেন, সুপ্রকাশ রায় ও বাংলাপিডিয়াও ঘটনাটি উল্লেখ করেছে। রুপার কাঁকন দিয়ে গুলির কাজ চালানোর বিবরণ মিত্রের, তবে তা স্মৃতিনির্ভর। ছেঁড়া জুতা পাঠানোর গল্প ও ২১ নভেম্বরের প্রথম হামলার তারিখ স্থানীয় প্রচলিত বিবরণ, দলিলে পাওয়া যায়নি। ঘটনাটিকে ‘নীল বিদ্রোহ’ বলা বিতর্কিত।
১৮৪৯ সালে ইংরেজ মোরেল পরিবার পানগুছি-বলেশ্বরের মোহনার কাছে সুন্দরবনের যে লাটগুলো বন্দোবস্ত নেয়, বারইখালী গ্রামও ছিল তার মধ্যে। ইতিহাসবিদ সতীশচন্দ্র মিত্র ‘যশোহর-খুলনার ইতিহাস’ গ্রন্থের দ্বিতীয় খণ্ডে লিখেছেন, মহকুমা সদর খুলনা থেকে বহু দূরের এই দুর্গম জমিদারিতে মোরেলরাই ছিলেন সর্বেসর্বা; সরকারি আইনের তেমন তোয়াক্কা না করে প্রায় নিজেদের মতো প্রজা শাসন করতেন। বড় ভাই রবার্ট মোরেল বিচক্ষণ হলেও তাঁর কর্মচারীরা প্রায়ই মাত্রা ছাড়াত। জমিদারির বেতনভোগী লাঠিয়াল বাহিনীর দলপতি ছিলেন ম্যানেজার ডেনিস হেলি; মিত্রের ভাষ্যে, তিনি আগে ছিলেন সামান্য বেতনের এক সৈনিক, পরে বেশি টাকার আশায় মোরেলদের চাকরিতে আসেন।
বারইখালীর মাতব্বর প্রজা রহিমুল্লাহ ছিলেন সবল, পরিশ্রমী কৃষক, স্বভাবে তেজি। হেলির বাড়াবাড়িতে অতিষ্ঠ প্রজাদের পক্ষ নিতেন বলে সাহেবরা আগে থেকেই তাঁর ওপর রুষ্ট ছিলেন। ১৮৬১ সালের নভেম্বরে প্রতিবেশী গুণী মামুদ তালুকদারের সঙ্গে জমির সীমানা নিয়ে তাঁর বিরোধ বাধে। মীমাংসা করতে গিয়ে হেলি গুণী মামুদের পক্ষ নেন; রহিমুল্লাহ সেই মীমাংসা মানেননি, উল্টো সাহেবকে কড়া কথা শুনিয়ে দেন। অপমানের শোধ নিতে হেলি লাঠিয়াল নিয়ে চড়াও হন, কিন্তু সেদিনের সংঘর্ষে তাঁর পক্ষের রামধন মালো নিহত হলে তাঁকে পিছু হটতে হয়।
পরের দিন আরও অনেক লাঠিয়াল নিয়ে হেলি রহিমুল্লাহর বাড়ি ঘিরে ফেলেন। ভেতরে ছিলেন অল্প কয়েকজন স্বজন আর সামান্য গুলি-বারুদ। সুন্দরবন অঞ্চলের অনেক বাড়ির মতো এই বাড়ির চারদিকেও গড় বা পরিখা কাটা ছিল। মিত্রের বিবরণ অনুযায়ী, সামনের পথে ভেজা কাঁথা টাঙিয়ে তার আড়াল থেকে রহিমুল্লাহ সারা রাত গুলি চালান; গুলি ফুরিয়ে গেলে বাড়ির নারীদের হাতের রুপার কাঁকন ভেঙে সেই টুকরো দিয়ে কাজ চালানো হয়। শেষ রাতে বারুদও ফুরালে ঢাল আর রামদা হাতে তিনি লাফিয়ে বেরিয়ে আসেন; তখনই হেলি ও আরেকজনের গুলিতে তাঁর মৃত্যু হয়।
মিত্রের হিসাবে এই সংঘর্ষে ১৭ জন নিহত এবং বহু মানুষ আহত হন, যাঁদের বেশির ভাগই ছিলেন সাহেবপক্ষের লোক। লাশগুলো জঙ্গলে নিয়ে পুড়িয়ে ফেলা হয়। গ্রামের অনেকে আগেই পালিয়েছিলেন; যাঁরা ছিলেন, পরদিন সকাল পর্যন্ত তাঁদের ঘর লুট হয়, আগুনে পোড়ে, নারীরাও নির্যাতনের শিকার হন। লেখকের বাবা প্যারীমোহন মিত্র তখন খুলনায় ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের অধীনে কাজ করতেন; সফরে গিয়ে তিনি দেখেছিলেন, গরু-বাছুর আর ঘরবাড়ি ফেলে গোটা গ্রাম ফাঁকা হয়ে গেছে। এরপর যে তদন্ত ও মামলা শুরু হয়, তা গড়ায় বহু বছর।
বাংলাপিডিয়া রহিমুল্লাহর মৃত্যুর তারিখ ১৮৬১ সালের ২৫ নভেম্বর উল্লেখ করেছে; স্থানীয় বিবরণে ২১ নভেম্বর প্রথম হামলা আর ২৫ নভেম্বর রাতের শেষ লড়াইয়ের কথা বলা হয়। ঘটনাটিকে অনেকে নীল বিদ্রোহের অংশ বলেন, মোরেলদের কুঠিকেও লোকে ‘নীলকুঠি’ বলে। তবে ১৮৬০ সালের নীল কমিশনে দেওয়া মোরেলের সাক্ষ্য এবং মিত্রের বই—দুটোতেই আছে, মোরেলগঞ্জে নীলচাষ হতো না; বিরোধের মূলে ছিল জমিদারির লাঠিয়াল-শাসন আর জমির বিবাদ। লোকমুখে আরও প্রচলিত, খাজনার দাবির জবাবে রহিমুল্লাহ কাঠের বাক্সে ভরে ছেঁড়া জুতা পাঠিয়েছিলেন—এর কোনো দলিল মেলে না। মোরেলগঞ্জ উপজেলা তথ্য বাতায়ন তাঁকে ইংরেজবিরোধী লড়াকু সৈনিক হিসেবে স্মরণ করে, আর কৃষক আন্দোলনের ইতিহাসবিদ সুপ্রকাশ রায় বারইখালীর লড়াইকে বাংলার কৃষক-সংগ্রামের উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত বলেছেন।