বাঘ, ঝড় ও আবাদের বিবরণ সমকালীন সরকারি প্রতিবেদন থেকে নেওয়া। বাঘটি কোন মোরেল ভাই মেরেছিলেন, সূত্রে বলা নেই। পুরোনো বসতির ধারণাটি ওয়েস্টল্যান্ডের অনুমান।
উনিশ শতকের মাঝামাঝি মোরেলগঞ্জ আর আজকের শরণখোলার বিস্তীর্ণ এলাকা ছিল ঘন সুন্দরবন। ইংরেজ কর্মকর্তা জেমস ওয়েস্টল্যান্ড যশোর জেলা নিয়ে তাঁর প্রতিবেদনে (দ্বিতীয় সংস্করণ, ১৮৭৪) এই বন কেটে আবাদের যে ছবি এঁকেছেন, তা আজও এই জনপদের জন্মকথা বোঝার ভালো উৎস। তিনি লিখেছেন, কোনো কোনো গাছ এত বিশাল যে টুকরো টুকরো করে কেটে তবেই নামানো যেত; মোরেলগঞ্জে এমন এক গাছ নতুন নতুন কাণ্ড নামিয়ে প্রায় এক একর জায়গা জুড়ে ছড়িয়ে ছিল। নিচে থাকত প্রায় দুর্ভেদ্য ঝোপ, যা একটু একটু করে কুপিয়ে পথ বের করতে হতো।
ওয়েস্টল্যান্ডের বর্ণনায়, প্রথম ও সবচেয়ে কঠিন সাফাইয়ের খরচ বহন করতেন সরকারের কাছ থেকে জমি বন্দোবস্ত নেওয়া মালিক; জমি খানিকটা তৈরি হলে তিনি প্রজা বসাতেন, যাঁরা নিজেদের ‘আবাদকারী’ বলতেন এবং জমিতে এক রকম দখলি স্বত্ব দাবি করতেন। উত্তরের কচুয়া-বাগেরহাট-খুলনার দিকের অনেক চাষির সুন্দরবনেও জমি ছিল। চৈত্র থেকে জ্যৈষ্ঠ নিজের গ্রামে চাষ সেরে তাঁরা লাঙল, গরু আর খাবার নৌকায় তুলে ‘আবাদে’ চলে যেতেন; আষাঢ় থেকে ভাদ্র সেখানে ছোট ছাউনিতে থেকে চাষ করতেন। এক বছর জমি ফেলে রাখলেই নলখাগড়ার বন গজিয়ে যেত, তিনবার উপড়ে না ফেলা পর্যন্ত তা নির্মূল হতো না। শরণখোলার রায়েন্দা ইউনিয়নের তথ্য বাতায়নেও বলা হয়েছে, ১৮৬১ সালের দিকে বরিশাল অঞ্চল থেকে আসা মানুষ জঙ্গল কেটে এই জনপদ গড়েন; উপজেলা বাতায়ন জানায়, তাই শরণখোলার কথ্যভাষায় বরিশালের টান স্পষ্ট।
সবচেয়ে বড় ভয় ছিল বাঘ। ওয়েস্টল্যান্ড লিখেছেন, কোনো কোনো ভয়ংকর বাঘের উৎপাতে বছরের পর বছর খেটে তৈরি করা আবাদ ছেড়ে বসতিকারীদের সরে যেতে হয়েছে। ১৮৬৮ সালে এক মানুষখেকো বাঘের কথা প্রায়ই শোনা যেত—সপ্তাহে এক-দুজন মানুষ তুলে নেওয়ার খবর আসত। একদিন সে এক ইংরেজের নৌকায় উঠে মাঝিদের এক-দুজনকে নিয়ে যায়; ইংরেজ ভদ্রলোক বন্দুক তাক করলে বন্দুকটাই ফেটে গিয়ে তিনি আহত হন। শেষে মোরেলগঞ্জের মোরেল সাহেব নিজেকে লোহার খাঁচায় বন্দি করে বাঘটির জন্য ওত পেতে থাকেন। গুলি খেয়ে আহত বাঘ খাঁচায় ঝাঁপিয়ে পড়ে সেটি উল্টে দেয়, কিন্তু এরপর তার উৎপাত থেমে যায়—অর্থাৎ ক্ষতটাই তার প্রাণ নিয়েছিল। ওয়েস্টল্যান্ড আরও জানিয়েছেন, এই বা অন্য কোনো বাঘ মোরেলগঞ্জের কাছের এক খালে নৌকা আক্রমণ শুরু করলে কিছুদিন সেই পথ প্রায় পরিত্যক্ত হয়ে গিয়েছিল। ১৯০৮ সালের খুলনা গেজেটিয়ার ঘটনাটি আবার উদ্ধৃত করেছে।
আরেক শত্রু ছিল ঝড় আর জলোচ্ছ্বাস। ঘরবাড়ি আর খেত জোয়ারের সর্বোচ্চ সীমা থেকে মাত্র এক-দুই ফুট উঁচু; ঝড়ের ঢেউ পশুর আর হরিণঘাটা ধরে ঢুকে পুরো এলাকা ভাসিয়ে দিত। ওয়েস্টল্যান্ডের হিসাবে ১৮৬৯ সালের ১৬ মে-র ঘূর্ণিঝড়ে কেবল মোরেলগঞ্জের আশপাশেই ২৫০ জনের প্রাণ যায়। তিনি সতর্ক করেছিলেন, সাগরের যত কাছে আবাদ যাবে, বিপদ তত বাড়বে, আর বন যত কাটা হবে, চাষি ও সাগরের ঢেউয়ের মাঝখানের আড়াল তত ছোট হবে। দেড় শ বছর পরের সিডর এই সতর্কবাণী আবার মনে করিয়ে দেয়।
আবাদ করতে গিয়ে মানুষ মাঝে মাঝে অবাক করা জিনিসও পেত। মোরেলগঞ্জ এস্টেটের দেওয়ান ওয়েস্টল্যান্ডকে জানিয়েছিলেন, মোরেলগঞ্জের আবাদকারী এবং অন্য বন-সাফকারীরা জঙ্গলের ভেতরে ইটের ঘাট, পুকুরের চিহ্ন, এমনকি কোথাও কোথাও ইটের ভাটাও খুঁজে পেয়েছেন—যদিও কোনো বাড়ির ধ্বংসাবশেষ তাঁর জানামতে মেলেনি। এ থেকে ওয়েস্টল্যান্ড অনুমান করেছিলেন, সুন্দরবনের এই অংশে বহু আগেও মানুষের বসতি ছিল; তিনি একে খানজাহান আলী ও প্রতাপাদিত্যের আমলের দক্ষিণমুখী বসতিবিস্তারের সঙ্গে মেলাতে চেয়েছিলেন। এটি তাঁর অনুমান, প্রত্নতাত্ত্বিকভাবে যাচাই করা হয়নি।