বাণিজ্য, বন্দর ও জমিদারি বদলের তথ্য সমকালীন সরকারি প্রতিবেদন ও ইতিহাসগ্রন্থে লিপিবদ্ধ। থানা গঠনের সাল নিয়ে সূত্রে অমিল আছে। রবার্ট মোরেলের মৃত্যুর নির্দিষ্ট তারিখ কেবল একটি স্থানীয় সংবাদ প্রতিবেদনে পাওয়া গেছে, তাই এটি যাচাই-সাপেক্ষ।
উনিশ শতকের সত্তরের দশকে মোরেলগঞ্জ ছিল সুন্দরবন-অঞ্চলের এক ব্যস্ত গঞ্জ। জেমস ওয়েস্টল্যান্ডের বর্ণনায়, চারপাশের মানুষ ফসল বেচতে আর নিত্যপণ্য কিনতে এখানেই আসত, আর পূর্বাঞ্চলের জেলাগুলোর বেশির ভাগ পণ্য কলকাতায় যাওয়ার নৌপথটিও এর পাশ দিয়েই। রোজ বাজার বসত, শুক্র ও সোমবার হাট; হাটবারে নদী-খাল ভরে যেত নৌকা আর দেশি জাহাজে, প্রচুর চাল হাতবদল হয়ে কলকাতায় যেত। নৌকা তৈরির ব্যবসাও ছিল জমজমাট, আর মাটির বড় বড় পাত্রের কদর ছিল আলাদা—পশ্চিমমুখী নৌকাগুলোর জন্য মোরেলগঞ্জ ছিল মিঠা পানি নেওয়ার শেষ জায়গা, সুন্দরবন পাড়ি দিতে তারা এখান থেকেই পাত্রে পানি ভরে নিত। পঞ্চাশ বছর পরেও সতীশচন্দ্র মিত্র দেখেছেন, সোম ও শুক্রবারের হাট টিকে আছে, প্রধান পণ্য ধান-চাল।
পানগুছির গভীর খাত সমুদ্রগামী জাহাজের পোতাশ্রয় হতে পারে—এই ভরসায় মোরেলরা জায়গাটিকে বন্দর ঘোষণা করিয়েছিলেন, কয়েকটি জাহাজ এখান থেকে মালও তুলেছিল। ওয়েস্টল্যান্ড লিখেছিলেন, মোরেলগঞ্জ একদিন সুন্দরবনের বাণিজ্যিক রাজধানী হবে বলে তাঁর দৃঢ় বিশ্বাস। ১৯০৮ সালের খুলনা গেজেটিয়ার জানায়, ১৮৬৯ সালে বাংলা সরকার এখানকার নদীকে বন্দর ঘোষণা করে, বয়াও বসানো হয়; কিন্তু সমুদ্রবাণিজ্যের কেন্দ্র বানানোর চেষ্টা সফল হয়নি। তবু ধানসমৃদ্ধ অঞ্চলের হাট আর কাছাড়-সুন্দরবন স্টিমার সার্ভিসের গুরুত্বপূর্ণ স্টেশন হিসেবে মোরেলগঞ্জের গুরুত্ব থেকে যায়। ১৯০১ সালের আদমশুমারিতে গ্রামটির জনসংখ্যা ছিল ৯৭২; ছিল থানা, সাব-রেজিস্ট্রি অফিস আর দাতব্য চিকিৎসালয়। ওয়েস্টল্যান্ডের তথ্যে, ১৮৬৩ সালের আগে জায়গাটি ছিল বাকেরগঞ্জ জেলায়, পরে রামপাল থানার অধীনে, আর ১৮৬৬ সালের দিকে আলাদা থানা হয়; বাংলাপিডিয়া অবশ্য মোরেলগঞ্জ থানা গঠনের সাল ১৯০৯ বলেছে।
মোরেলদের সুদিন বেশি দিন টেকেনি। সতীশচন্দ্র মিত্রের বিবরণে, বারইখালীর মামলায় বিপুল খরচ আর বদনামের পর বড় ভাই রবার্ট মোরেল বরিশালে মারা যান; তাঁর মৃত্যুর পর ১, ২ ও ৩ নম্বর লাট মহারাজা দুর্গাচরণ লাহার কাছে বন্ধক রেখে ঋণ নেওয়া হয়। ১৮৭৮ সালে একমাত্র জীবিত ভাই উইলিয়াম দেনার দায়ে সম্পত্তি বিক্রির উদ্যোগ নিলে পরের বছর লাহা অন্য বন্ধকি দেনা শোধ করে মোরেলদের পুরো সম্পত্তি কিনে নেন। গেজেটিয়ার বলছে, রবার্টের মৃত্যুর পর ব্যবস্থাপনা খারাপ হয়ে পড়েছিল; ১৮৮১ সালের আদমশুমারিতে মোরেলগঞ্জ থানার জনসংখ্যা কমে যাওয়ার একটি কারণ ছিল এস্টেট বিক্রির পর সুন্দরবনের কিছু আবাদ পরিত্যক্ত হওয়া। ১৯০৮ সালে মোরেলগঞ্জের দাতব্য চিকিৎসালয় চালাতেন মহারাজকুমার ঋষিকেশ লাহা।
একই সময়ে পাশের বনগ্রামেও ছিল এক জমিদারবাড়ি। ১৯০৮ সালের গেজেটিয়ার জানায়, খুলনা জেলায় জমিদারদের চালানো তিনটি বেসরকারি দাতব্য চিকিৎসালয়ের একটি ছিল বনগ্রামে—নাম ‘বিন্দুবাসিনী ডিসপেনসারি’, চালাতেন শ্রীমতী কমলকুমারী চৌধুরাণী। সরকারি সাহায্য ছাড়া চলা ইংরেজি স্কুলগুলোর তালিকায় আছে ‘বনগ্রাম সেঞ্চুরি স্কুল’; বাংলাপিডিয়া বনগ্রাম সেন্সুরি ইনস্টিটিউশনের প্রতিষ্ঠাকাল ১৯০১ বলেছে এবং বনগ্রামের রাজবাড়িকে উপজেলার প্রাচীন নিদর্শনের তালিকায় রেখেছে।
সেই জৌলুস এখন স্মৃতি। মোরেলগঞ্জ উপজেলা তথ্য বাতায়ন জায়গাটিকে ‘এককালের ছোট কলিকাতা’ বলে উল্লেখ করেছে। পানগুছির ভাঙন বারবার শহরের মানচিত্র বদলেছে—২০১১ সালে দ্য ডেইলি স্টার জানায়, আগের দশ বছরে নদী হাজারো বাড়ি, দোকান, বাজার, মসজিদ-মন্দির গ্রাস করেছে, আর মোরেলের স্মৃতিস্তম্ভও বিলীন হওয়ার ঝুঁকিতে। মিত্র লিখেছেন, মোরেলগঞ্জে রবার্ট মোরেলের স্মরণে একটি সুন্দর স্মৃতিস্তম্ভ আছে; ২০২৬ সালের এক স্থানীয় প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তার সাদা পাথরে তাঁর মৃত্যুর কথা ও নির্মাতাদের নাম খোদাই করা, আর রবার্ট মোরেল ১৮৬৮ সালের ১৩ মে বরিশালে মারা যান।