নামকরণ ও আবাদের তথ্য সমকালীন সরকারি প্রতিবেদন (ওয়েস্টল্যান্ড ১৮৭৪, গেজেটিয়ার ১৯০৮) ও সতীশচন্দ্র মিত্রের গ্রন্থে লিপিবদ্ধ। মোরেল ভাইদের নাম নিয়ে সূত্রে সামান্য অমিল আছে। কুঠিবাড়িকে ‘নীলকুঠি’ বলা লোকপ্রচলিত, দলিলসমর্থিত নয়। কিছু সাম্প্রতিক সংবাদে ‘রবার্ট মোরেল ১৮৪৯ সালে মারা যান’ বা ‘ভবনটি ১৪২ বছরের পুরোনো’ লেখা হয়েছে, যা পুরোনো সূত্রের সঙ্গে মেলে না বলে এখানে নেওয়া হয়নি।
মোরেলগঞ্জ নামের আগে এই জায়গার নাম ছিল সরালিয়া। ১৮৭৪ সালে প্রকাশিত যশোর জেলার প্রতিবেদনে ইংরেজ কর্মকর্তা জেমস ওয়েস্টল্যান্ড লিখেছেন, ‘মোরেলগঞ্জ’ নামটি নতুন—দেওয়া হয়েছিল গঞ্জ আর বাজারকে, গ্রামের নাম ছিল সরালিয়া। ১৯০৮ সালের খুলনা জেলা গেজেটিয়ারেও একই কথা আছে; সেখানে বলা হয়েছে, মোরেলগঞ্জ পানগুছি নদীর তীরে, বলেশ্বরের সঙ্গে সংগমের আড়াই মাইল উজানে। নামটি আজও টিকে আছে—১৯৭১ সালে মুক্তিযোদ্ধারা সরালিয়া গ্রামেই একটি অ্যামবুশ করেছিলেন।
সুন্দরবন আবাদের জন্য ১৮২৮ সালের এক আইনে সীমানা ঠিক করার পর ১৮৩০ সালের দিকে কমিশনার ড্যাম্পিয়ারের তত্ত্বাবধানে জরিপ হয়, বন ভাগ করা হয় ‘লাট’ বা খণ্ডে। সতীশচন্দ্র মিত্র লিখেছেন, বলেশ্বরের তীরের ১ থেকে ৪ নম্বর লাট আর বারইখালী গ্রাম প্রথমে টাকীর জমিদার কালীনাথ মুন্সীর সঙ্গে ৯৯ বছরের জন্য বন্দোবস্ত হয়েছিল; কিন্তু কয়েক বছরে তিনি ৮০০ বিঘার বেশি আবাদ করতে না পারায় বাকি জমি নতুন করে বন্দোবস্তের আদেশ হয়। তখন শ্রীমতী মোরেল নামের এক ইংরেজ নারী ১৮৪৯ সালে লাটগুলো নিজের ছেলেদের নামে বন্দোবস্ত নেন। তাঁর চার ছেলে—রবার্ট, টমাস, উইলিয়াম ইভান্স ও হেনরি; টমাস অল্প বয়সে মারা যান। বাকি তিন ভাই নৌকায় এসে বলেশ্বর-পানগুছির সংগমের কাছে সরালিয়ায় জঙ্গল কেটে বসতি গড়েন। গেজেটিয়ারে অবশ্য ক্রেতা হিসেবে ‘আর. ও টি. এইচ. মোরেল’-এর নাম আছে, আর বলা হয়েছে, ১৮৪০ সালের দিকে কিছু দখলদার সেখানে আগেই খানিকটা জঙ্গল সাফ করেছিল।
গেজেটিয়ারের তথ্যে, ১৮৫১ সালের মধ্যেই প্রায় ১০ হাজার মানুষ সেখানে কাজ করছিল; অল্প দিনে নদীর ধারে প্রায় ৯ মাইল এলাকা সাফ হয়ে চাষের আওতায় আসে, আর শ্রমিকদের অনেকে স্থায়ী প্রজা হয়ে থেকে যান। নদীর পাড়ে মোরেলরা নিজেদের বাসভবন বানান, আধা মাইল উত্তরে তিন নদী আর একটি খালের মিলনস্থলে বসান বাজার—নাম দেন নিজেদের পদবিতে, মোরেলগঞ্জ। ওয়েস্টল্যান্ড লিখেছেন, ভিতহীন নরম মাটিতে সেই বাড়ি তুলতে কয়েক বছরের ধৈর্যশীল শ্রম লেগেছিল, আর বাজার ও বাড়ির জমি কৃত্রিমভাবে উঁচু করা হয়েছিল।
আজ লোকমুখে মোরেলদের বাড়িকে ‘নীলকুঠি’ বলা হলেও সমকালীন দলিল অন্য কথা বলে। ১৮৬০ সালে নীল কমিশনের প্রতিবেদনের ওপর বাংলার ছোটলাট জন পিটার গ্রান্ট যে মন্তব্য লেখেন, তাতে মোরেলের সাক্ষ্য উদ্ধৃত হয়েছে: দশ বছরে তিনি ৬০-৬৫ হাজার বিঘা জঙ্গল আবাদ করেছেন, প্রজাদের বিঘাপ্রতি এক টাকা দুই আনা স্থায়ী খাজনায় জমি দিয়েছেন; প্রজারা আগাম টাকা নিতে রাজি হতো না, পাছে নীলচাষে বাঁধা পড়তে হয়। কলকাতা থেকে আসা বীজের প্যাকেটে ভুল করে নীলের বীজ এসে বাগানে গাছ গজালে প্রজারাই জোর করে তা উপড়ে ফেলায়। মোরেল আরও বলেছিলেন, পাকা দোতলা বাড়ি তোলা ছিল তাঁর সবচেয়ে সৌভাগ্যের সিদ্ধান্তগুলোর একটি, কারণ এতে প্রজারা নিশ্চিত হয়েছিল যে তিনি তাদের মধ্যেই থাকবেন। সতীশচন্দ্র মিত্রও লিখেছেন, মোরেলগঞ্জে নীলচাষ বা দাদন প্রথা ছিল না। তবে ওয়েস্টল্যান্ড মোরেলদের অদম্য উদ্যমের প্রশংসা করলেও লিখেছিলেন, তাঁদের পুরো কাহিনি বলার স্বাধীনতা তাঁর নেই।
মোরেলদের সেই কুঠিবাড়ি (বাংলাপিডিয়ায় নির্মাণকাল ১৮৪৯ উল্লেখিত) আজ জীর্ণ অবস্থায় দাঁড়িয়ে; স্থানীয়ভাবে এটি ‘মোড়ল সাহেবের বাড়ি’ নামেও পরিচিত। ২০২৪ সালে প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর একে প্রত্নসম্পদের তালিকায় তোলে। ২০২৫ সালে বাসসের প্রতিবেদনে অধিদপ্তরের এক কর্মকর্তা জানান, স্থাপনাটির প্রায় ৬০ শতাংশ ইতিমধ্যে নষ্ট হয়ে গেছে; দরজা-জানালা, সিঁড়ি, লোহার সিন্দুক বেহাত হয়েছে, পাশের স্মৃতিস্তম্ভ থেকেও জিনিসপত্র চুরি গেছে।