সরালিয়া থেকে মোরেলগঞ্জ: এক ইংরেজ পরিবারের আবাদ ও নামকরণ

প্রমাণিত ইতিহাসব্রিটিশ আমল১৮৩০–১৮৬০-এর দশকমোরেলগঞ্জ সদর (সরালিয়া), পানগুছি নদীর তীর

পানগুছির পাড়ের গ্রামটির নাম ছিল সরালিয়া। ১৮৪৯ সালে এক ইংরেজ নারী ছেলেদের নামে সুন্দরবনের লাট বন্দোবস্ত নেওয়ার পর জঙ্গল কেটে গড়ে ওঠে বাজার—নাম হয় মোরেলগঞ্জ। আর ‘নীলকুঠি’ নিয়ে প্রচলিত ধারণা কতটা ঠিক?

নামকরণ ও আবাদের তথ্য সমকালীন সরকারি প্রতিবেদন (ওয়েস্টল্যান্ড ১৮৭৪, গেজেটিয়ার ১৯০৮) ও সতীশচন্দ্র মিত্রের গ্রন্থে লিপিবদ্ধ। মোরেল ভাইদের নাম নিয়ে সূত্রে সামান্য অমিল আছে। কুঠিবাড়িকে ‘নীলকুঠি’ বলা লোকপ্রচলিত, দলিলসমর্থিত নয়। কিছু সাম্প্রতিক সংবাদে ‘রবার্ট মোরেল ১৮৪৯ সালে মারা যান’ বা ‘ভবনটি ১৪২ বছরের পুরোনো’ লেখা হয়েছে, যা পুরোনো সূত্রের সঙ্গে মেলে না বলে এখানে নেওয়া হয়নি।

মোরেলগঞ্জ নামের আগে এই জায়গার নাম ছিল সরালিয়া। ১৮৭৪ সালে প্রকাশিত যশোর জেলার প্রতিবেদনে ইংরেজ কর্মকর্তা জেমস ওয়েস্টল্যান্ড লিখেছেন, ‘মোরেলগঞ্জ’ নামটি নতুন—দেওয়া হয়েছিল গঞ্জ আর বাজারকে, গ্রামের নাম ছিল সরালিয়া। ১৯০৮ সালের খুলনা জেলা গেজেটিয়ারেও একই কথা আছে; সেখানে বলা হয়েছে, মোরেলগঞ্জ পানগুছি নদীর তীরে, বলেশ্বরের সঙ্গে সংগমের আড়াই মাইল উজানে। নামটি আজও টিকে আছে—১৯৭১ সালে মুক্তিযোদ্ধারা সরালিয়া গ্রামেই একটি অ্যামবুশ করেছিলেন।

সুন্দরবন আবাদের জন্য ১৮২৮ সালের এক আইনে সীমানা ঠিক করার পর ১৮৩০ সালের দিকে কমিশনার ড্যাম্পিয়ারের তত্ত্বাবধানে জরিপ হয়, বন ভাগ করা হয় ‘লাট’ বা খণ্ডে। সতীশচন্দ্র মিত্র লিখেছেন, বলেশ্বরের তীরের ১ থেকে ৪ নম্বর লাট আর বারইখালী গ্রাম প্রথমে টাকীর জমিদার কালীনাথ মুন্সীর সঙ্গে ৯৯ বছরের জন্য বন্দোবস্ত হয়েছিল; কিন্তু কয়েক বছরে তিনি ৮০০ বিঘার বেশি আবাদ করতে না পারায় বাকি জমি নতুন করে বন্দোবস্তের আদেশ হয়। তখন শ্রীমতী মোরেল নামের এক ইংরেজ নারী ১৮৪৯ সালে লাটগুলো নিজের ছেলেদের নামে বন্দোবস্ত নেন। তাঁর চার ছেলে—রবার্ট, টমাস, উইলিয়াম ইভান্স ও হেনরি; টমাস অল্প বয়সে মারা যান। বাকি তিন ভাই নৌকায় এসে বলেশ্বর-পানগুছির সংগমের কাছে সরালিয়ায় জঙ্গল কেটে বসতি গড়েন। গেজেটিয়ারে অবশ্য ক্রেতা হিসেবে ‘আর. ও টি. এইচ. মোরেল’-এর নাম আছে, আর বলা হয়েছে, ১৮৪০ সালের দিকে কিছু দখলদার সেখানে আগেই খানিকটা জঙ্গল সাফ করেছিল।

গেজেটিয়ারের তথ্যে, ১৮৫১ সালের মধ্যেই প্রায় ১০ হাজার মানুষ সেখানে কাজ করছিল; অল্প দিনে নদীর ধারে প্রায় ৯ মাইল এলাকা সাফ হয়ে চাষের আওতায় আসে, আর শ্রমিকদের অনেকে স্থায়ী প্রজা হয়ে থেকে যান। নদীর পাড়ে মোরেলরা নিজেদের বাসভবন বানান, আধা মাইল উত্তরে তিন নদী আর একটি খালের মিলনস্থলে বসান বাজার—নাম দেন নিজেদের পদবিতে, মোরেলগঞ্জ। ওয়েস্টল্যান্ড লিখেছেন, ভিতহীন নরম মাটিতে সেই বাড়ি তুলতে কয়েক বছরের ধৈর্যশীল শ্রম লেগেছিল, আর বাজার ও বাড়ির জমি কৃত্রিমভাবে উঁচু করা হয়েছিল।

আজ লোকমুখে মোরেলদের বাড়িকে ‘নীলকুঠি’ বলা হলেও সমকালীন দলিল অন্য কথা বলে। ১৮৬০ সালে নীল কমিশনের প্রতিবেদনের ওপর বাংলার ছোটলাট জন পিটার গ্রান্ট যে মন্তব্য লেখেন, তাতে মোরেলের সাক্ষ্য উদ্ধৃত হয়েছে: দশ বছরে তিনি ৬০-৬৫ হাজার বিঘা জঙ্গল আবাদ করেছেন, প্রজাদের বিঘাপ্রতি এক টাকা দুই আনা স্থায়ী খাজনায় জমি দিয়েছেন; প্রজারা আগাম টাকা নিতে রাজি হতো না, পাছে নীলচাষে বাঁধা পড়তে হয়। কলকাতা থেকে আসা বীজের প্যাকেটে ভুল করে নীলের বীজ এসে বাগানে গাছ গজালে প্রজারাই জোর করে তা উপড়ে ফেলায়। মোরেল আরও বলেছিলেন, পাকা দোতলা বাড়ি তোলা ছিল তাঁর সবচেয়ে সৌভাগ্যের সিদ্ধান্তগুলোর একটি, কারণ এতে প্রজারা নিশ্চিত হয়েছিল যে তিনি তাদের মধ্যেই থাকবেন। সতীশচন্দ্র মিত্রও লিখেছেন, মোরেলগঞ্জে নীলচাষ বা দাদন প্রথা ছিল না। তবে ওয়েস্টল্যান্ড মোরেলদের অদম্য উদ্যমের প্রশংসা করলেও লিখেছিলেন, তাঁদের পুরো কাহিনি বলার স্বাধীনতা তাঁর নেই।

মোরেলদের সেই কুঠিবাড়ি (বাংলাপিডিয়ায় নির্মাণকাল ১৮৪৯ উল্লেখিত) আজ জীর্ণ অবস্থায় দাঁড়িয়ে; স্থানীয়ভাবে এটি ‘মোড়ল সাহেবের বাড়ি’ নামেও পরিচিত। ২০২৪ সালে প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর একে প্রত্নসম্পদের তালিকায় তোলে। ২০২৫ সালে বাসসের প্রতিবেদনে অধিদপ্তরের এক কর্মকর্তা জানান, স্থাপনাটির প্রায় ৬০ শতাংশ ইতিমধ্যে নষ্ট হয়ে গেছে; দরজা-জানালা, সিঁড়ি, লোহার সিন্দুক বেহাত হয়েছে, পাশের স্মৃতিস্তম্ভ থেকেও জিনিসপত্র চুরি গেছে।

গল্পের জায়গাগুলো

তথ্যসূত্র

  1. A Report on the District of Jessore: its antiquities, its history and its commerce (2nd edition) · J. Westland, Bengal Secretariat Press, Calcutta, ১৮৭৪
  2. Bengal District Gazetteers: Khulna · L. S. S. O'Malley, Bengal Secretariat Book Depot, Calcutta, ১৯০৮
  3. যশোহর-খুলনার ইতিহাস, দ্বিতীয় খণ্ড (‘রেণী ও মরেল-কাহিনী’ অধ্যায়, পৃ. ৭৯৮–৮০৭) · সতীশচন্দ্র মিত্র; ইন্টারনেট আর্কাইভে সংরক্ষিত দ্বিতীয় সংস্করণ, ১৯৬৫
  4. মোড়েলগঞ্জ উপজেলা · বাংলাপিডিয়া, বাংলাদেশ এশিয়াটিক সোসাইটি
  5. প্রত্নস্থল-পুরাকীর্তির তালিকায় রবার্ট মোরেলের নীলকুঠিসহ ২৫৬ স্থাপনা-নিদর্শন · বণিক বার্তা, ২০২৪
  6. বাগেরহাটের নীলকর মোরেলের কুঠিবাড়ি সংস্কারের উদ্যোগ · বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থা (বাসস), ২০২৫

কোনো তথ্য ভুল মনে হলে বা আরও ভালো সূত্র জানা থাকলে নিচে জানান; যাচাই করে ঠিক করা হবে।

মোরেলগঞ্জ-এর আরও গল্প

সব দেখুন
বন কেটে আবাদ: বাঘ, নলখাগড়া আর ঝড়ের সঙ্গে লড়াইদেড় শ বছর আগে মোরেলগঞ্জ-শরণখোলার মাটি ছিল ঘন সুন্দরবন। লোহার খাঁচায় বসে মানুষখেকো বাঘ শিকার, এক বছর অবহেলায় ফিরে আসা নলবন আর ১৮৬৯ সালের ঝড়—সমকালীন সরকারি প্রতিবেদনে আবাদের কঠিন দিনগুলোর ছবি।প্রমাণিত ইতিহাসডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট বঙ্কিমচন্দ্র ও মোরেলগঞ্জ মামলাবারইখালীর হত্যাকাণ্ডের তদন্তে নৌকায় মোরেলগঞ্জে ছুটে গিয়েছিলেন খুলনার তরুণ মহকুমা ম্যাজিস্ট্রেট বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়। লাখ টাকার ঘুষের প্রস্তাব ফিরিয়ে দেওয়া, বৃন্দাবন ও বোম্বাই থেকে আসামি ধরা, আর শেষে হেলির খালাস—মামলার আদ্যোপান্ত।প্রমাণিত ইতিহাসবারইখালীর রহিমুল্লাহ: মোরেলদের লাঠিয়ালের বিরুদ্ধে এক রাতের লড়াই১৮৬১ সালের নভেম্বরে বারইখালীর কৃষক রহিমুল্লাহ মোরেল জমিদারির ম্যানেজার ডেনিস হেলির লাঠিয়াল-বন্দুকধারীদের বিরুদ্ধে সারা রাত লড়ে প্রাণ দেন। দক্ষিণ বাংলার কৃষক-প্রতিরোধের এই অধ্যায় নিয়ে যা দলিলে আছে, আর যা কেবল লোকমুখে।প্রমাণিত ইতিহাসবন্দরের স্বপ্ন থেকে ‘ছোট কলকাতা’: মোরেলগঞ্জের হাট, জাহাজ আর জমিদারি বদলএক ইংরেজ কর্মকর্তা ভেবেছিলেন, মোরেলগঞ্জ একদিন হবে সুন্দরবনের ‘বাণিজ্যিক রাজধানী’। ১৮৬৯ সালে বন্দর ঘোষণা, হাটবারে নৌকার ভিড়, মিঠা পানির শেষ ঘাট—তারপর মোরেলদের জমিদারি হাতবদল আর পানগুছির ভাঙন।প্রমাণিত ইতিহাস