৩৬০ বিঘায় পোঁতা ধন: খানজাহানের গুপ্তধনের কিংবদন্তি

লোককথা / জনশ্রুতিসুলতানি আমল ও খান জাহানপনের শতক (জনশ্রুতি লিপিবদ্ধ ১৮৭১–১৯১৪)ষাটগম্বুজ ও খানজাহান আলী মাজার এলাকা, বাগেরহাট সদর

লোকে বিশ্বাস করত, খানজাহান ৩৬০ বিঘা জমিতে ধনরাশি পুঁতে রেখে গেছেন। সেই বিশ্বাসে কেউ দুজন মিলে চাষ করত না—আর ধনের লোভে খোঁড়া হয়েছে মসজিদের স্তম্ভ, মিহরাব, এমনকি সমাধির মেঝে।

গুপ্তধনের অস্তিত্ব সম্পূর্ণ জনশ্রুতি। জনশ্রুতিটি যে প্রচলিত ছিল এবং ধনের আশায় খোঁড়াখুঁড়িতে স্থাপনার ক্ষতি হয়েছে, তা ১৮৭১, ১৯০৮ ও ১৯১৪ সালের সূত্রে নথিভুক্ত।

খানজাহানকে ঘিরে সবচেয়ে টেকসই লোককথাগুলোর একটি গুপ্তধনের। সতীশচন্দ্র মিত্র ১৯১৪ সালে লিখেছেন, খানজাহানের সময় থেকেই প্রচার ছিল যে তিনি ৩৬০ বিঘা জমিতে অগণিত ধনরাশি পুঁতে রেখে গেছেন। জনশ্রুতি অনুযায়ী রাজস্বের একটা অংশ তিনি দানে খরচ করতেন, একটা অংশ মসজিদ-ইমারত বানাতে স্থানীয় শ্রমিকদের মজুরিতে, আর বাকিটা প্রজাদের জন্য মাটির নিচে রেখে দিতেন।

এই বিশ্বাস মানুষের দৈনন্দিন জীবনেও ছাপ ফেলেছিল। মিত্র শুনেছিলেন, এলাকায় দুজন মিলে এক জমিতে লাঙল দিত না—হঠাৎ ধন উঠলে ভাগ নিয়ে ঝগড়া বাধবে, এই ভয়ে। কেউ কেউ আবার এর পেছনে খানজাহানের ‘কৌশল’ দেখতেন: ধনের লোভে মানুষ জমি গভীর করে খুঁড়বে, তাতে মাটি উল্টে উর্বর হবে। মিত্র নিজেই স্বীকার করেছেন, সত্যিই এমন উদ্দেশ্য ছিল কি না, জানার উপায় নেই।

ষাট গম্বুজকে ঘিরেও আছে এমন গল্প। ১৮৭১ সালে জেমস ওয়েস্টল্যান্ডকে দেখানো হয়েছিল, মসজিদের পাথরের বেদিতে দুটি গর্ত—লোকে বলত, সেখানে খানজাহান তাঁর টাকার বাক্স রাখতেন। মিত্র লিখেছেন, খানজাহান যে বেদিতে বসে দরবার করতেন বলে কথিত, তার পেছনে পাথরের আড়ালে ধন ছিল, আর কেউ দেয়াল ভেঙে তা নিয়ে গেছে—লোকে সেই ভাঙা জায়গা দেখাত।

এই বিশ্বাসের দাম দিতে হয়েছে স্থাপনাগুলোকে। ১৯০৮ সালের খুলনা গেজেটিয়ার ষাট গম্বুজের মেঝের নিচে গুপ্তধনের গল্পকে বিশ্বাসযোগ্য মনে করেনি, তবু লিখেছে, চোরেরা ধনের আশায় স্তম্ভ খুঁড়েছে, আর স্থানীয় কথা অনুযায়ী পশ্চিম দেয়ালের একটি মিহরাব ভেঙে ফুটো করেছে। খানজাহানের সমাধির মেঝে ও বেদির রঙিন টালির বড় অংশ নষ্ট হওয়ার জন্যও খাদেমরা রাতে কবর খুঁড়তে আসা চোরদের দায়ী করেছিলেন। মিত্র লিখেছেন, ধনের লোভে অনেক মসজিদের ভিত খোঁড়া হয়েছে, কোনো কোনোটি ভেঙেই ফেলা হয়েছে।

খানজাহানের পোঁতা ধনের অস্তিত্বের কোনো প্রমাণ নেই; এটি পুরোপুরি জনশ্রুতি। বসতভিটা প্রত্নস্থলে প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের খননে যা মিলেছে, তা মাটির পাত্র, টালি, পাইপ আর দেয়ালের ভিত—সোনার কলস নয়। খলিফাতাবাদের আসল সম্পদ তার মসজিদ, দিঘি আর রাস্তা, আর গুপ্তধনের লোভ সেগুলোরই সবচেয়ে বেশি ক্ষতি করেছে। ইউনেস্কোর বিবরণ অনুযায়ী এখানকার স্থাপনাগুলো এখন প্রত্নসম্পদ আইন, ১৯৬৮-এর অধীনে সুরক্ষিত; কেউ এগুলো বদলাতে বা নষ্ট করতে পারে না।

গল্পের জায়গাগুলো

তথ্যসূত্র

  1. যশোহর-খুলনার ইতিহাস, প্রথম খণ্ড — সতীশচন্দ্র মিত্র · চক্রবর্তী চ্যাটার্জি অ্যান্ড কোং, কলকাতা (ইন্টারনেট আর্কাইভে সংরক্ষিত), ১৯১৪
  2. A Report on the District of Jessore: Its Antiquities, Its History, and Its Commerce — J. Westland · ইন্টারনেট আর্কাইভ (মূল প্রতিবেদন, কলকাতা), ১৮৭১
  3. Bengal District Gazetteers: Khulna — L. S. S. O'Malley · ইন্টারনেট আর্কাইভ (মূল প্রকাশ, কলকাতা), ১৯০৮
  4. খানজাহান (র) এর বসতভিটা · প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর, খুলনা বিভাগ, ২০২৬
  5. Historic Mosque City of Bagerhat (Outstanding Universal Value) · UNESCO World Heritage Centre, ১৯৮৫

কোনো তথ্য ভুল মনে হলে বা আরও ভালো সূত্র জানা থাকলে নিচে জানান; যাচাই করে ঠিক করা হবে।

বাগেরহাট সদর-এর আরও গল্প

সব দেখুন
সমাধির পাথরে লেখা শেষ কথাখানজাহানের সমাধিবেদির পাথরই তাঁর সম্পর্কে সবচেয়ে বিশ্বাসযোগ্য দলিল। সেখানে তিনি নিজেকে বলেছেন বৃদ্ধ, দুর্বল এক প্রবাসী—আর লিখে রেখেছেন মৃত্যুর তারিখ।প্রমাণিত ইতিহাসখলিফাতাবাদ: খানজাহানের পরের টাকশাল-শহর আর মোগল ‘সরকার’খানজাহানের মৃত্যুর পরও খলিফাতাবাদ হারিয়ে যায়নি। সুলতানদের মুদ্রায় এর নাম উঠেছে, মোগল রাজস্বের খাতায় এটি ছিল আস্ত এক ‘সরকার’—আর বাগেরহাটের ‘দশানী’ নামেও হয়তো লুকিয়ে আছে সেই হিসাবের ছাপ।প্রমাণিত ইতিহাসপ্রতাপাদিত্য, ফিরিঙ্গি আর মগ: বারো ভূঁইয়ার যুগে বাগেরহাটষোড়শ-সপ্তদশ শতকে যশোরের রাজা প্রতাপাদিত্যের রাজ্য ছুঁয়ে ছিল আজকের বাগেরহাট; একই সময়ে পর্তুগিজ ‘ফিরিঙ্গি’ আর আরাকানি মগ জলদস্যুর হানায় উজাড় হয়েছিল দক্ষিণের বহু জনপদ। কোনটা প্রমাণিত, কোনটা জনশ্রুতি?ইতিহাস ও জনশ্রুতিভৈরবের বাঁকে বাঁকে: নদী, হাট আর নৌপথের বাগেরহাটএকসময় বাগেরহাটে চলাফেরা মানেই ছিল নৌকা। কলকাতাগামী ধানের জাহাজ, মোড়েলগঞ্জের বন্দর, স্টিমারের হুইসেল—মরে আসা ভৈরব আর বদলে যাওয়া নদীপথের গল্প।প্রমাণিত ইতিহাস