ফকিরের তাকিয়া: কালাচাঁদ ফকির ও বারইখালীর অগ্রহায়ণের মেলা

ইতিহাস ও জনশ্রুতিলোককথামোরেলদের আগমনের (১৮৪৯) আগে থেকে; মেলা এখনো চলছেবারইখালী (ফকিরের তাকিয়া), মোরেলগঞ্জ

মোরেল সাহেবরা আসার বহু আগে বারইখালীর জঙ্গলে আস্তানা গেড়েছিলেন কালাচাঁদ ফকির। তাঁর নামে আজও প্রতি ২৫ অগ্রহায়ণ মেলা বসে, আর লোকমুখে ফেরে বাঘের পিঠে চড়া, আগুনে না-পোড়া চাদর আর এক রহস্যময় ভবিষ্যদ্বাণীর গল্প।

ফকিরের আস্তানা, শিষ্য মঙ্গল জমাদার ও রবিউল্যা কাজি এবং ২৫ অগ্রহায়ণের মেলার কথা সতীশচন্দ্র মিত্রের গ্রন্থে লিপিবদ্ধ, আর মেলাটি এখনো হয়। নদীতে ভেসে আসা শিশু, আগুনে না-পোড়া চাদর, বাঘের পিঠে চড়া ও জীবন্ত সমাধির গল্প জনশ্রুতি। ‘টুপিওয়ালা-টিকিওয়ালা’ উক্তিটি লোকমুখে প্রচলিত, যা মিত্র লিখে রেখেছেন। মেলার বয়স (২০৮ বা ৩০০ বছর) কোনো দলিলে নিশ্চিত নয়।

মোরেলগঞ্জের বারইখালীর একটি মৌজার নাম ‘ফকিরের তাকিয়া’; নামটির পেছনে আছে এক ফকিরের আস্তানার গল্প। সতীশচন্দ্র মিত্র ‘যশোহর-খুলনার ইতিহাস’-এর দ্বিতীয় খণ্ডের এক পাদটীকায় লিখেছেন, বারইখালীর আরেক নামই ছিল ফকিরের তাকিয়া; কারণ মোরেল সাহেবদের আসার বহু আগে কালাচাঁদ নামের এক খ্যাতিমান ফকির কচুয়া থানার মঙ্গল জমাদার নামের এক শিষ্যকে সঙ্গে নিয়ে এখানে এসে জঙ্গলের মধ্যে আস্তানা গাড়েন।

মিত্রের বিবরণে, মঙ্গল পরে সপরিবারে সেই আস্তানার কাছেই বসত গড়েন, আর তাঁর জামাতা রবিউল্যা কাজি হন ফকিরের চেলা। ফকিরের নির্দেশে প্রতিবছর ২৫ অগ্রহায়ণ আস্তানার পাশে মেলা বসত, যেখানে সাত-আট হাজার মানুষ আসত; মিত্রের সময়েও মেলায় ভিড় কম হতো না, আর আস্তানার আয় ভোগ করতেন রবিউল্যার নাতিরা। প্রায় এক শ বছর পরও তারিখটি বদলায়নি। ২০২৪ সালে প্রতিদিনের বাংলাদেশ জানিয়েছে, প্রতিবছর ২৫ অগ্রহায়ণ থেকে বারইখালীর কাজীবাড়ি চত্বরে তিন দিনের মেলা শুরু হয়; রাতভর চলে ওয়াজ, ওরস, মুর্শিদি ও মাইজভান্ডারি গান, ভক্তরা মাজারে আগরবাতি-মোমবাতি জ্বালান, মানত করেন।

কালাচাঁদকে ঘিরে লোকমুখে নানা অলৌকিক কাহিনি প্রচলিত। জনশ্রুতি আছে, শিশু অবস্থায় তিনি পানগুছি নদীতে ভেসে এসে কাজীবাড়ির এক বটগাছের নিচে আশ্রয় নেন। কেউ তাঁকে একটি চাদর দিলে তিনি তা আগুনে ছুড়ে ফেলেন, পরে আগুন থেকে অক্ষত চাদর তুলে ফেরত দেন—এমন গল্পও শোনা যায়। অনেকের বিশ্বাস, তিনি বাঘের পিঠে চড়ে ঘুরতেন; আবার বলা হয়, কাজীবাড়িতেই তিনি জীবন্ত সমাধি নেন। এসব কাহিনির কোনো দলিল নেই, আর মিত্রের বিবরণের সঙ্গেও এগুলো মেলে না—সেখানে কালাচাঁদ শিষ্যসহ আসা এক প্রাপ্তবয়স্ক ফকির।

মিত্র ফকিরের একটি উক্তিও লিখে রেখেছেন: ‘আবাদ করিবে টুপিওয়ালা, খাবে টিকিওয়ালা।’ অর্থাৎ টুপি-পরা সাহেবরা জঙ্গল কেটে আবাদ করবে, কিন্তু ভোগ করবে টিকিধারীরা। মোরেলদের জমিদারি পরে সত্যিই এক হিন্দু জমিদার পরিবারের হাতে যায়; মিত্র রসিকতা করে যোগ করেছেন, আবাদ সাহেবের হাত থেকে হিন্দুর হাতে এসেছে বটে, তবে তখনো ‘ব্রাহ্মণত্ব’ হয়নি। উক্তিটি সত্যিই ফকিরের মুখের, নাকি পরের ঘটনার আলোয় গড়ে ওঠা লোককথা—তা যাচাইয়ের কোনো উপায় নেই।

মেলার বয়স নিয়েও মতভেদ আছে। ইত্তেফাক ২০২২ সালের মেলাকে ‘২০৮তম’ বলেছে, আবার অন্য প্রতিবেদনে একে প্রায় ৩০০ বছরের পুরোনো বলা হয়েছে। কোভিড-১৯ মহামারির কারণে তিন বছর বন্ধ থাকার পর ২০২২ সালে উপজেলা প্রশাসনের তত্ত্বাবধানে আবার মেলা বসে। বাংলাপিডিয়া মোরেলগঞ্জের উল্লেখযোগ্য মেলার তালিকায় কালাচাঁদ আউলিয়ার মেলার নাম রেখেছে, আর উপজেলা তথ্য বাতায়নও কালাচাঁদের মাজারকে এলাকার দর্শনীয় স্থানের মধ্যে গুনেছে।

তথ্যসূত্র

  1. যশোহর-খুলনার ইতিহাস, দ্বিতীয় খণ্ড (‘রেণী ও মরেল-কাহিনী’ অধ্যায়, পৃ. ৭৯৮–৮০৭) · সতীশচন্দ্র মিত্র; ইন্টারনেট আর্কাইভে সংরক্ষিত দ্বিতীয় সংস্করণ, ১৯৬৫
  2. কালাচাঁদের মেলার ঐতিহ্য ৩০০ বছরের · প্রতিদিনের বাংলাদেশ, ২০২৪
  3. মোরেলগঞ্জে শুরু হচ্ছে ২০৮ বছরের ঐতিহ্যবাহী কালাচাঁদ আউলিয়ার মেলা · দৈনিক ইত্তেফাক, ২০২২
  4. মোড়েলগঞ্জ উপজেলা · বাংলাপিডিয়া, বাংলাদেশ এশিয়াটিক সোসাইটি
  5. মোরেলগঞ্জ মুক্তিযোদ্ধা স্মৃতি ফলক (দর্শনীয় স্থান) · মোরেলগঞ্জ উপজেলা তথ্য বাতায়ন, ২০২৩

কোনো তথ্য ভুল মনে হলে বা আরও ভালো সূত্র জানা থাকলে নিচে জানান; যাচাই করে ঠিক করা হবে।

মোরেলগঞ্জ-এর আরও গল্প

সব দেখুন
বন কেটে আবাদ: বাঘ, নলখাগড়া আর ঝড়ের সঙ্গে লড়াইদেড় শ বছর আগে মোরেলগঞ্জ-শরণখোলার মাটি ছিল ঘন সুন্দরবন। লোহার খাঁচায় বসে মানুষখেকো বাঘ শিকার, এক বছর অবহেলায় ফিরে আসা নলবন আর ১৮৬৯ সালের ঝড়—সমকালীন সরকারি প্রতিবেদনে আবাদের কঠিন দিনগুলোর ছবি।প্রমাণিত ইতিহাসসরালিয়া থেকে মোরেলগঞ্জ: এক ইংরেজ পরিবারের আবাদ ও নামকরণপানগুছির পাড়ের গ্রামটির নাম ছিল সরালিয়া। ১৮৪৯ সালে এক ইংরেজ নারী ছেলেদের নামে সুন্দরবনের লাট বন্দোবস্ত নেওয়ার পর জঙ্গল কেটে গড়ে ওঠে বাজার—নাম হয় মোরেলগঞ্জ। আর ‘নীলকুঠি’ নিয়ে প্রচলিত ধারণা কতটা ঠিক?প্রমাণিত ইতিহাসডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট বঙ্কিমচন্দ্র ও মোরেলগঞ্জ মামলাবারইখালীর হত্যাকাণ্ডের তদন্তে নৌকায় মোরেলগঞ্জে ছুটে গিয়েছিলেন খুলনার তরুণ মহকুমা ম্যাজিস্ট্রেট বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়। লাখ টাকার ঘুষের প্রস্তাব ফিরিয়ে দেওয়া, বৃন্দাবন ও বোম্বাই থেকে আসামি ধরা, আর শেষে হেলির খালাস—মামলার আদ্যোপান্ত।প্রমাণিত ইতিহাসবারইখালীর রহিমুল্লাহ: মোরেলদের লাঠিয়ালের বিরুদ্ধে এক রাতের লড়াই১৮৬১ সালের নভেম্বরে বারইখালীর কৃষক রহিমুল্লাহ মোরেল জমিদারির ম্যানেজার ডেনিস হেলির লাঠিয়াল-বন্দুকধারীদের বিরুদ্ধে সারা রাত লড়ে প্রাণ দেন। দক্ষিণ বাংলার কৃষক-প্রতিরোধের এই অধ্যায় নিয়ে যা দলিলে আছে, আর যা কেবল লোকমুখে।প্রমাণিত ইতিহাস