দিঘিটি খানজাহানের আমলের এবং ১৯০৮ সালে এতে কুমির ছিল—এ তথ্য নথিভুক্ত। ঘোড়ার দৌড়ে দৈর্ঘ্য মাপা এবং ৩৬০টি দিঘির কথা জনশ্রুতি। ‘কোদাল ধোয়া দিঘি’ সম্পর্কে নির্ভরযোগ্য সূত্র পাওয়া যায়নি।
ষাট গম্বুজ মসজিদের পেছনে, পশ্চিম দিকে বিশাল যে দিঘি, তার নাম ঘোড়া দিঘি। সতীশচন্দ্র মিত্রের ‘যশোহর-খুলনার ইতিহাস’ (১৯১৪) অনুযায়ী, বাগেরহাটে এসে খানজাহান প্রথম যেখানে সেনাছাউনি বসান, সেখানেই তাঁর প্রথম দিঘি কাটা হয়—এই ঘোড়া দিঘি। দিঘিটি পূর্ব-পশ্চিমে লম্বা। বাংলাপিডিয়ার খানজাহান ভুক্তিতে এর মাপ প্রায় ১,৫০০ × ৭৫০ ফুট, আবার ‘খলিফাতাবাদ’ ভুক্তিতে আয়তন প্রায় ১০০ একর বলা হয়েছে; দুটি হিসাব পরস্পরের সঙ্গে মেলে না।
নামের পেছনের গল্পটিই সবচেয়ে মজার। জনশ্রুতি আছে, একটি ঘোড়া যতদূর দৌড়ে গিয়েছিল, দিঘিটি ততটাই লম্বা করে কাটা হয়েছিল। ১৯০৮ সালের খুলনা গেজেটিয়ারে গল্পটি একটু অন্যভাবে আছে—খানজাহান নাকি দিঘিটি ততটা লম্বা করেছিলেন, যতদূর একটি ঘোড়া ক্লান্ত না হয়ে দৌড়াতে পারে। মিত্রও একই প্রবাদ লিখেছেন। এর পক্ষে কোনো লিখিত প্রমাণ নেই; এটি লোকমুখের ব্যাখ্যা।
শুধু গল্প নয়, দিঘির পানির সুনামও ছিল। মিত্র লিখেছেন, দিঘিটি এত গভীর যে সারা বছর পানি থাকে, আর এর মতো ভালো পানি নিম্নবঙ্গের খুব কম জলাশয়েই আছে বলে তাঁর ধারণা। ১৯০৮ সালে এই দিঘিতেও কুমির ছিল; ‘কালাপার’, ‘ধলাপার’ বলে ডাকলে তারা খেতে আসত বলে গেজেটিয়ারে লেখা আছে। দিঘির পূর্ব পাড়ে ষাট গম্বুজ, আর পশ্চিম পাড়ে বিবি বেগনী মসজিদ।
খানজাহানের শহরে দিঘি ছিল অসংখ্য। ওয়েস্টল্যান্ড (১৮৭১) লিখেছিলেন, খানজাহান যেখানে ভবন বানাতেন, পাশে একটি দিঘিও কাটতেন। প্রবাদ অনুযায়ী ৩৬০টি মসজিদের মতো দিঘিও ছিল ৩৬০টি, যেগুলোর নাম তাঁর প্রধান সঙ্গীদের নামে—বখতিয়ার খাঁ, ইখতিয়ার খাঁ, আলম খাঁ, দরিয়া খাঁ প্রমুখ। মিত্রের তালিকায় আছে বুড়া খাঁর দিঘি, ইখতিয়ার খাঁর ‘প্রকাণ্ড’ দিঘি, আর প্রায় আধা মাইল লম্বা সরু ‘পচা দিঘি’। পচা দিঘির পানি ভালো ছিল না, সম্ভবত সে কারণেই এমন নাম—মিত্রের অনুমান।
নোনা পানির দেশে এই দিঘিগুলোই ছিল খাওয়ার পানির প্রধান উৎস। ইউনেস্কো খলিফাতাবাদের পানি সরবরাহ, জলাধার ও নিষ্কাশনব্যবস্থাকে পরিকল্পনা-দক্ষতার প্রমাণ হিসেবে উল্লেখ করেছে। আজ যে কয়েকটি দিঘি টিকে আছে, ঘোড়া দিঘি তাদের অন্যতম। ‘কোদাল ধোয়া দিঘি’ নামে আরেকটি দিঘির কথা শোনা গেলেও এর ইতিহাস বা নামকরণের কোনো নির্ভরযোগ্য বিবরণ আমরা খুঁজে পাইনি।