গোপাল সাধুর জীবনকথা মূলত একটি মতুয়া ভক্তিগ্রন্থ থেকে নেওয়া, যেখানে অলৌকিক রক্ষা ও ঈশ্বরের কৃপার কথা বিশ্বাস হিসেবে বলা হয়েছে; জন্মসাল, দান ও গুরুচাঁদের সফরের বিবরণ স্বাধীন দলিলে যাচাই করা যায়নি। বারুণী স্নানের সাম্প্রতিক তথ্য সংবাদভিত্তিক। ১৯৭১ সালের গণহত্যার তারিখ নিয়ে সূত্রভেদে অমিল আছে।
মোরেলগঞ্জের প্রত্যন্ত গ্রাম লক্ষ্মীখালী বছরে একবার মতুয়া ভক্তদের ঢাক-কাঁসর আর হরিধ্বনিতে মুখর হয়ে ওঠে। এর কেন্দ্রে আছেন গোপালচাঁদ সাধু ঠাকুর—মতুয়া মতের প্রবর্তক হরিচাঁদ ঠাকুর ও তাঁর পুত্র গুরুচাঁদ ঠাকুরের এক নিবেদিত ভক্ত। বাংলাদেশ মুক্তিযুদ্ধ জ্ঞানকোষ তাঁকে মতুয়া সম্প্রদায়ের অন্যতম ধর্মগুরু বলে উল্লেখ করেছে, আর বাংলাপিডিয়া লক্ষ্মীখালী আশ্রমকে মোরেলগঞ্জের প্রাচীন নিদর্শনের তালিকায় রেখেছে।
আচার্য মহানন্দ হালদারের ‘শ্রীশ্রীগুরুচাঁদ চরিত’ মতুয়া ভক্তিসাহিত্যের একটি পদ্যগ্রন্থ; সেখানে গোপালের জীবনকথা আছে। এ বিবরণ অনুযায়ী তিনি বাংলা ১২৮০ সালে (১৮৭৩–৭৪) তৎকালীন খুলনা জেলার লক্ষ্মীখালী গ্রামে এক নমঃশূদ্র পরিবারে জন্মান; বাবা রামচরণ হাওলাদার, মা কালী দেবী। ছেলেবেলায় গরু চরানোর ফাঁকে তাঁর মন পড়ে থাকত ভক্তিতে। একই গ্রন্থে বলা হয়েছে, বাংলা ১৩২৩ সালে (১৯১৬–১৭) হরিচাঁদ ঠাকুরের জীবনকাব্য ‘শ্রীশ্রীহরিলীলামৃত’ ছাপার পাঁচ শতাধিক টাকা গোপাল একাই দিয়েছিলেন, আর পরে গুরুচাঁদের নাতি প্রমথরঞ্জন ঠাকুরের বিলেতে পড়ার খরচ হিসেবে চৌদ্দ হাজার টাকা দেওয়ার অঙ্গীকার করেছিলেন। গুরুচাঁদ ঠাকুর নিজেও লক্ষ্মীখালীতে এসেছিলেন এবং সেখানে কালীপূজা করেছিলেন বলে গ্রন্থটিতে উল্লেখ আছে।
গোপালের পথ সহজ ছিল না। একই গ্রন্থ জানায়, তাঁর মতুয়া ভক্তিচর্চা নিয়ে এলাকার একদল বিরোধী ক্ষুব্ধ ছিল; তারা টাকা দিয়ে জমিদারির নায়েবকে রাজি করায়, যাতে গোপাল ও তাঁর বাড়িতে আসা দেবীচাঁদ গোস্বামীকে কাছারিবাড়িতে ডেকে অপমান ও জরিমানা করা হয়। ভক্তিগ্রন্থটি গোপালের নিরাপদে ঘরে ফেরাকে ঈশ্বরের কৃপা হিসেবে দেখিয়েছে। এসব বিবরণ বিশ্বাসনির্ভর; স্বাধীন দলিলে যাচাই করা যায়নি।
ফাইন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেসের প্রতিবেদন অনুযায়ী, বাংলা ১৩২৮ সাল থেকে প্রতিবছর লক্ষ্মীখালীতে গোপালচাঁদ সাধুর লীলাধামে মতুয়া ভক্তদের মিলনমেলা বসে, যা গোপালগঞ্জের ওড়াকান্দির বারুণী উৎসবের ১৫ দিন পর হয়। ভক্তরা ‘কামনা সাগর’ নামের জলাশয়ে পুণ্যস্নান করেন। ২০২৫ সালের এপ্রিলে তিন দিনের ১০৩তম বারুণী স্নান ও মতুয়া মেলায় চার শতাধিক নিবন্ধিত দল আর লাখো ভক্ত অংশ নেন বলে প্রতিবেদনে জানানো হয়, যাঁদের কেউ কেউ ভারত, শ্রীলঙ্কা, নেপাল ও ভুটান থেকেও এসেছিলেন। স্থানীয়ভাবে উৎসবটি ‘গোপাল সাধুর মেলা’ নামে পরিচিত; বাংলাপিডিয়াও মোরেলগঞ্জের প্রধান মেলাগুলোর মধ্যে এর নাম রেখেছে।
১৯৭১ সালে এই তীর্থও রক্তাক্ত হয়েছিল। মুক্তিযুদ্ধ জ্ঞানকোষের বিবরণ অনুযায়ী, যুদ্ধ শুরুর পর অসংখ্য ভক্ত নিরাপত্তার আশায় সাধুর বাড়িতে এসে আশ্রয় নিয়েছিলেন। ২৩ মে রাজাকার বাহিনীর একটি বড় দল সেখানে হামলা চালিয়ে লুটপাট, অগ্নিসংযোগ ও নারী নির্যাতন করে এবং মুক্তিযোদ্ধা ইয়াকুব আলী মেম্বারসহ ১৭৯ জনকে গুলি করে হত্যা করে—ঘটনাটি লক্ষ্মীখালী গণহত্যা নামে পরিচিত। শরণখোলা উপজেলা তথ্য বাতায়নের মুক্তিযুদ্ধ-বিবরণে লক্ষ্মীখালীর সাধুবাড়িতে এই হামলার সময় জুনের শেষ দিক বলা হয়েছে।