লক্ষ্মীখালীর গোপাল সাধু ও কামনা সাগরের বারুণী স্নান

ইতিহাস ও জনশ্রুতিব্রিটিশ আমল১২৮০ বঙ্গাব্দ (১৮৭৩–৭৪) থেকে; বারুণী স্নান ১৩২৮ বঙ্গাব্দ (১৯২১–২২) থেকেলক্ষ্মীখালী, মোরেলগঞ্জ

সুন্দরবনের কোলের এক গ্রামে জন্মেছিলেন মতুয়া সাধক গোপালচাঁদ। তাঁর দানে ছাপা হয়েছিল হরিচাঁদ ঠাকুরের জীবনকাব্য, তাঁর বাড়িতে আজও লাখো ভক্ত বারুণী স্নানে আসেন—আর ১৯৭১ সালে এই আশ্রয়স্থলেই ঘটেছিল এক নির্মম গণহত্যা।

গোপাল সাধুর জীবনকথা মূলত একটি মতুয়া ভক্তিগ্রন্থ থেকে নেওয়া, যেখানে অলৌকিক রক্ষা ও ঈশ্বরের কৃপার কথা বিশ্বাস হিসেবে বলা হয়েছে; জন্মসাল, দান ও গুরুচাঁদের সফরের বিবরণ স্বাধীন দলিলে যাচাই করা যায়নি। বারুণী স্নানের সাম্প্রতিক তথ্য সংবাদভিত্তিক। ১৯৭১ সালের গণহত্যার তারিখ নিয়ে সূত্রভেদে অমিল আছে।

মোরেলগঞ্জের প্রত্যন্ত গ্রাম লক্ষ্মীখালী বছরে একবার মতুয়া ভক্তদের ঢাক-কাঁসর আর হরিধ্বনিতে মুখর হয়ে ওঠে। এর কেন্দ্রে আছেন গোপালচাঁদ সাধু ঠাকুর—মতুয়া মতের প্রবর্তক হরিচাঁদ ঠাকুর ও তাঁর পুত্র গুরুচাঁদ ঠাকুরের এক নিবেদিত ভক্ত। বাংলাদেশ মুক্তিযুদ্ধ জ্ঞানকোষ তাঁকে মতুয়া সম্প্রদায়ের অন্যতম ধর্মগুরু বলে উল্লেখ করেছে, আর বাংলাপিডিয়া লক্ষ্মীখালী আশ্রমকে মোরেলগঞ্জের প্রাচীন নিদর্শনের তালিকায় রেখেছে।

আচার্য মহানন্দ হালদারের ‘শ্রীশ্রীগুরুচাঁদ চরিত’ মতুয়া ভক্তিসাহিত্যের একটি পদ্যগ্রন্থ; সেখানে গোপালের জীবনকথা আছে। এ বিবরণ অনুযায়ী তিনি বাংলা ১২৮০ সালে (১৮৭৩–৭৪) তৎকালীন খুলনা জেলার লক্ষ্মীখালী গ্রামে এক নমঃশূদ্র পরিবারে জন্মান; বাবা রামচরণ হাওলাদার, মা কালী দেবী। ছেলেবেলায় গরু চরানোর ফাঁকে তাঁর মন পড়ে থাকত ভক্তিতে। একই গ্রন্থে বলা হয়েছে, বাংলা ১৩২৩ সালে (১৯১৬–১৭) হরিচাঁদ ঠাকুরের জীবনকাব্য ‘শ্রীশ্রীহরিলীলামৃত’ ছাপার পাঁচ শতাধিক টাকা গোপাল একাই দিয়েছিলেন, আর পরে গুরুচাঁদের নাতি প্রমথরঞ্জন ঠাকুরের বিলেতে পড়ার খরচ হিসেবে চৌদ্দ হাজার টাকা দেওয়ার অঙ্গীকার করেছিলেন। গুরুচাঁদ ঠাকুর নিজেও লক্ষ্মীখালীতে এসেছিলেন এবং সেখানে কালীপূজা করেছিলেন বলে গ্রন্থটিতে উল্লেখ আছে।

গোপালের পথ সহজ ছিল না। একই গ্রন্থ জানায়, তাঁর মতুয়া ভক্তিচর্চা নিয়ে এলাকার একদল বিরোধী ক্ষুব্ধ ছিল; তারা টাকা দিয়ে জমিদারির নায়েবকে রাজি করায়, যাতে গোপাল ও তাঁর বাড়িতে আসা দেবীচাঁদ গোস্বামীকে কাছারিবাড়িতে ডেকে অপমান ও জরিমানা করা হয়। ভক্তিগ্রন্থটি গোপালের নিরাপদে ঘরে ফেরাকে ঈশ্বরের কৃপা হিসেবে দেখিয়েছে। এসব বিবরণ বিশ্বাসনির্ভর; স্বাধীন দলিলে যাচাই করা যায়নি।

ফাইন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেসের প্রতিবেদন অনুযায়ী, বাংলা ১৩২৮ সাল থেকে প্রতিবছর লক্ষ্মীখালীতে গোপালচাঁদ সাধুর লীলাধামে মতুয়া ভক্তদের মিলনমেলা বসে, যা গোপালগঞ্জের ওড়াকান্দির বারুণী উৎসবের ১৫ দিন পর হয়। ভক্তরা ‘কামনা সাগর’ নামের জলাশয়ে পুণ্যস্নান করেন। ২০২৫ সালের এপ্রিলে তিন দিনের ১০৩তম বারুণী স্নান ও মতুয়া মেলায় চার শতাধিক নিবন্ধিত দল আর লাখো ভক্ত অংশ নেন বলে প্রতিবেদনে জানানো হয়, যাঁদের কেউ কেউ ভারত, শ্রীলঙ্কা, নেপাল ও ভুটান থেকেও এসেছিলেন। স্থানীয়ভাবে উৎসবটি ‘গোপাল সাধুর মেলা’ নামে পরিচিত; বাংলাপিডিয়াও মোরেলগঞ্জের প্রধান মেলাগুলোর মধ্যে এর নাম রেখেছে।

১৯৭১ সালে এই তীর্থও রক্তাক্ত হয়েছিল। মুক্তিযুদ্ধ জ্ঞানকোষের বিবরণ অনুযায়ী, যুদ্ধ শুরুর পর অসংখ্য ভক্ত নিরাপত্তার আশায় সাধুর বাড়িতে এসে আশ্রয় নিয়েছিলেন। ২৩ মে রাজাকার বাহিনীর একটি বড় দল সেখানে হামলা চালিয়ে লুটপাট, অগ্নিসংযোগ ও নারী নির্যাতন করে এবং মুক্তিযোদ্ধা ইয়াকুব আলী মেম্বারসহ ১৭৯ জনকে গুলি করে হত্যা করে—ঘটনাটি লক্ষ্মীখালী গণহত্যা নামে পরিচিত। শরণখোলা উপজেলা তথ্য বাতায়নের মুক্তিযুদ্ধ-বিবরণে লক্ষ্মীখালীর সাধুবাড়িতে এই হামলার সময় জুনের শেষ দিক বলা হয়েছে।

তথ্যসূত্র

  1. শ্রীশ্রীগুরুচাঁদ চরিত — ‘গোপাল সাধু’ (পৃ. ৩১৮) · আচার্য মহানন্দ হালদার (মতুয়া ভক্তিগ্রন্থ, অনলাইন পাঠ)
  2. শ্রীশ্রীগুরুচাঁদ চরিত — ‘শ্রীমৎ গোপাল চাঁদের নিঃস্বার্থ দান ও শ্রীশ্রীহরি লীলামৃত গ্রন্থ মুদ্রণ’ (পৃ. ৩৩৪) · আচার্য মহানন্দ হালদার (মতুয়া ভক্তিগ্রন্থ, অনলাইন পাঠ)
  3. শ্রীশ্রীগুরুচাঁদ চরিত — ‘পরম দয়াল শ্রীশ্রীগুরুচাঁদ (লক্ষ্মীখালী ভ্রমণ)’ (পৃ. ৫১৮) · আচার্য মহানন্দ হালদার (মতুয়া ভক্তিগ্রন্থ, অনলাইন পাঠ)
  4. সুন্দরবনের উপকূলীয় মোরেলগঞ্জে লাখো ভক্তের পদচারণায় মুখর লক্ষীখালী গোপাল চাঁদ মেলা, স্নান উৎসব · দ্য ফাইন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেস (বাংলা), ২০২৫
  5. লাখো ভক্তের পদচারণায় মুখরিত গোপাল চাঁদ বারুণী স্নান · দৈনিক জনকণ্ঠ, ২০২৫
  6. মোড়েলগঞ্জ উপজেলা · বাংলাপিডিয়া, বাংলাদেশ এশিয়াটিক সোসাইটি
  7. মুক্তিযুদ্ধে মোড়েলগঞ্জ উপজেলা (বাগেরহাট) — বাংলাদেশ মুক্তিযুদ্ধ জ্ঞানকোষ, ৮ম খণ্ড থেকে উদ্ধৃত · সংগ্রামের নোটবুক (মূল: বাংলাদেশ মুক্তিযুদ্ধ জ্ঞানকোষ, বাংলাদেশ এশিয়াটিক সোসাইটি, ২০২০)
  8. মুক্তিযুদ্ধে শরণখোলা উপজেলা (তথ্য সংগ্রহ ও গবেষণা: বীর মুক্তিযোদ্ধা আবু জাফর জব্বার) · শরণখোলা উপজেলা তথ্য বাতায়ন, ২০১৪

কোনো তথ্য ভুল মনে হলে বা আরও ভালো সূত্র জানা থাকলে নিচে জানান; যাচাই করে ঠিক করা হবে।

মোরেলগঞ্জ-এর আরও গল্প

সব দেখুন
বন কেটে আবাদ: বাঘ, নলখাগড়া আর ঝড়ের সঙ্গে লড়াইদেড় শ বছর আগে মোরেলগঞ্জ-শরণখোলার মাটি ছিল ঘন সুন্দরবন। লোহার খাঁচায় বসে মানুষখেকো বাঘ শিকার, এক বছর অবহেলায় ফিরে আসা নলবন আর ১৮৬৯ সালের ঝড়—সমকালীন সরকারি প্রতিবেদনে আবাদের কঠিন দিনগুলোর ছবি।প্রমাণিত ইতিহাসসরালিয়া থেকে মোরেলগঞ্জ: এক ইংরেজ পরিবারের আবাদ ও নামকরণপানগুছির পাড়ের গ্রামটির নাম ছিল সরালিয়া। ১৮৪৯ সালে এক ইংরেজ নারী ছেলেদের নামে সুন্দরবনের লাট বন্দোবস্ত নেওয়ার পর জঙ্গল কেটে গড়ে ওঠে বাজার—নাম হয় মোরেলগঞ্জ। আর ‘নীলকুঠি’ নিয়ে প্রচলিত ধারণা কতটা ঠিক?প্রমাণিত ইতিহাসডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট বঙ্কিমচন্দ্র ও মোরেলগঞ্জ মামলাবারইখালীর হত্যাকাণ্ডের তদন্তে নৌকায় মোরেলগঞ্জে ছুটে গিয়েছিলেন খুলনার তরুণ মহকুমা ম্যাজিস্ট্রেট বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়। লাখ টাকার ঘুষের প্রস্তাব ফিরিয়ে দেওয়া, বৃন্দাবন ও বোম্বাই থেকে আসামি ধরা, আর শেষে হেলির খালাস—মামলার আদ্যোপান্ত।প্রমাণিত ইতিহাসবারইখালীর রহিমুল্লাহ: মোরেলদের লাঠিয়ালের বিরুদ্ধে এক রাতের লড়াই১৮৬১ সালের নভেম্বরে বারইখালীর কৃষক রহিমুল্লাহ মোরেল জমিদারির ম্যানেজার ডেনিস হেলির লাঠিয়াল-বন্দুকধারীদের বিরুদ্ধে সারা রাত লড়ে প্রাণ দেন। দক্ষিণ বাংলার কৃষক-প্রতিরোধের এই অধ্যায় নিয়ে যা দলিলে আছে, আর যা কেবল লোকমুখে।প্রমাণিত ইতিহাস