বন কেটে শহর: খলিফাতাবাদের জন্ম

ইতিহাস ও জনশ্রুতিসুলতানি আমল ও খান জাহানপনের শতকের মাঝামাঝি; টাকশাল ১৫১৬–১৫৩৫ষাটগম্বুজ ইউনিয়ন থেকে বাগেরহাট শহর, বাগেরহাট সদর

সুন্দরবনের জলা-জঙ্গল কেটে গড়ে ওঠা খলিফাতাবাদকে বলা হয় ‘টাকশাল নগরী’। কিন্তু এখানে মুদ্রা ছাপার প্রথম প্রমাণ খানজাহানের মৃত্যুর প্রায় ছয় দশক পরের।

জঙ্গল আবাদ, খলিফাতাবাদ নাম, ১৫১৬–১৫৩৫ সালের মুদ্রা ও ইউনেস্কো স্বীকৃতি নথিভুক্ত। বারোবাজার থেকে বাগেরহাট পর্যন্ত যাত্রাপথ ও ‘বারাকপুর’ নামকরণ প্রবাদনির্ভর; বাগেরহাট নামের উৎস নিয়ে একাধিক মত, কোনোটিই প্রমাণিত নয়।

পনের শতকে আজকের বাগেরহাট ছিল সুন্দরবনের উত্তর প্রান্তের জলা-জঙ্গল। বাংলাপিডিয়া অনুযায়ী খানজাহান এই বনাঞ্চল জায়গির হিসেবে পেয়ে জঙ্গল কেটে বসতি গড়েন; তাঁর সহকারী বুরহান খান ও ফতেহ খান (সতীশচন্দ্র মিত্রের বইয়ে ‘বুড়া খাঁ’ ও তাঁর ছেলে ‘ফতে খাঁ’) কপোতাক্ষের তীরে মসজিদকুড় অঞ্চল আবাদ করেন। ইংরেজি উইকিপিডিয়ায় ইতিহাসবিদ রিচার্ড ইটনের গবেষণা উদ্ধৃত করে বলা হয়েছে, তাঁরা লোনা পানি ঠেকাতে বাঁধ দেন আর মিঠা পানির জন্য দিঘি কাটেন। ১৮৭১ সালে জেমস ওয়েস্টল্যান্ড লিখেছিলেন, বাগেরহাট ও মসজিদকুড় দুই জায়গার প্রবাদই বলে—তিনি এসেছিলেন সুন্দরবনের পতিত জমি আবাদ ও চাষের জন্য।

জনশ্রুতিতে তাঁর যাত্রাপথ বেশ বিস্তারিত। প্রথমে যশোরের বারোবাজার, সেখান থেকে ভৈরবের তীর ধরে মুড়লী কসবা, তারপর পয়োগ্রাম কসবা (বর্তমান খুলনার ফুলতলা অঞ্চল), শেষে বাগেরহাট। মিত্রের ‘যশোহর-খুলনার ইতিহাস’ (১৯১৪) অনুযায়ী, পথে পথে তিনি রাস্তা বানাতেন আর দিঘি কাটতেন; বাগেরহাটে প্রথম যেখানে সেনাছাউনি বসান, তার নাম দেন ‘বারাকপুর’, আর সেখানেই প্রথম দিঘি—ঘোড়া দিঘি। এই বিবরণ মূলত প্রবাদনির্ভর, তবে পথের ধারের পুরোনো মসজিদ ও দিঘিগুলো গল্পটিকে কিছুটা সমর্থন দেয়।

নতুন শহরের নাম খলিফাতাবাদ। বাংলাপিডিয়া শব্দটির অর্থ দিয়েছে ‘খলিফা বা প্রতিনিধির আবাস’; সুলতানের প্রতিনিধি হিসেবেই খানজাহান এ নাম রেখেছিলেন বলে ধারণা। আকবরের আমলের ‘আইন-ই-আকবরী’তে অঞ্চলটি ‘হাবেলী খলিফাতাবাদ’ নামে আছে, আর ষোল শতকের ডাচ-পর্তুগিজ মানচিত্রে নামটি বিকৃত হয়ে হয়েছে ‘কুইপিটাভাজ’। ওয়েস্টল্যান্ড জানিয়েছেন, টোডরমলের রাজস্ব বন্দোবস্তেও খলিফাতাবাদ পরগনার নাম আছে। ইউনেস্কোর বিবরণে শহরটি প্রায় ৫০ বর্গকিলোমিটারজুড়ে বিস্তৃত, আর এর পানি সরবরাহ ও নিষ্কাশন, জলাধার, রাস্তা ও সেতুকে পরিকল্পনা-দক্ষতার প্রমাণ বলা হয়েছে।

খলিফাতাবাদকে প্রায়ই ‘টাকশাল নগরী’ বলা হয়। কিন্তু বাংলাপিডিয়ার ‘মিন্ট টাউনস’ ভুক্তি অনুযায়ী এখানে মুদ্রা তৈরির প্রথম প্রমাণ ৯২২ হিজরির, অর্থাৎ ১৫১৬ সালের—খানজাহানের মৃত্যুর প্রায় ছয় দশক পরে। সেই মুদ্রা ছেপেছিলেন নুসরত শাহ, বাবার জীবদ্দশাতেই নিজের নামে মুদ্রা ছাপার অধিকার পেয়ে। পরে গিয়াসউদ্দিন মাহমুদ শাহের আমলেও এখানে মুদ্রা তৈরি হয়; তাঁর শেষ মুদ্রাটি ৯৪২ হিজরির (১৫৩৫)। তিনি শহরের নাম দেন ‘খলিফাতাবাদ-বদরপুর’। প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরও লিখেছে, মুদ্রার প্রমাণ থেকে পণ্ডিতেরা মনে করেন ষোল শতকে শহরটি খলিফাতাবাদ নামে পরিচিত ছিল।

খানজাহানের মৃত্যুর পর শহর ধীরে ধীরে জঙ্গলে ঢেকে যায়—ইউনেস্কো ও ওয়েস্টল্যান্ড দুজনেই এ কথা বলেছেন। আজকের বাগেরহাট শহর গড়ে উঠেছে পুরোনো খলিফাতাবাদের পূর্ব প্রান্তে। নামের উৎস নিয়ে ১৯০৮ সালের খুলনা গেজেটিয়ারে কয়েকটি মত আছে: ভৈরবের বাঁকের হাট, বাঘে ভরা জঙ্গলের হাট, বাকর নামের এক ব্যক্তির বসানো হাট, কিংবা খানজাহানের বাগানে বসা হাট। মিত্র শেষ মতটির পক্ষে ছিলেন। কোনটি ঠিক, তা আজও নিশ্চিত নয়।

গল্পের জায়গাগুলো

তথ্যসূত্র

  1. Khan Jahan · বাংলাপিডিয়া (এশিয়াটিক সোসাইটি অব বাংলাদেশ), ২০২১
  2. Khalifatabad · বাংলাপিডিয়া (এশিয়াটিক সোসাইটি অব বাংলাদেশ)
  3. Mint Towns · বাংলাপিডিয়া (এশিয়াটিক সোসাইটি অব বাংলাদেশ)
  4. এক নজরে — বিশ্ব সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য: ঐতিহাসিক মসজিদের শহর বাগেরহাট · প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর, বাগেরহাট, ২০২৪
  5. Historic Mosque City of Bagerhat (Outstanding Universal Value) · UNESCO World Heritage Centre, ১৯৮৫
  6. A Report on the District of Jessore: Its Antiquities, Its History, and Its Commerce — J. Westland · ইন্টারনেট আর্কাইভ (মূল প্রতিবেদন, কলকাতা), ১৮৭১
  7. যশোহর-খুলনার ইতিহাস, প্রথম খণ্ড — সতীশচন্দ্র মিত্র · চক্রবর্তী চ্যাটার্জি অ্যান্ড কোং, কলকাতা (ইন্টারনেট আর্কাইভে সংরক্ষিত), ১৯১৪
  8. Bengal District Gazetteers: Khulna — L. S. S. O'Malley · ইন্টারনেট আর্কাইভ (মূল প্রকাশ, কলকাতা), ১৯০৮
  9. Khan Jahan Ali · উইকিপিডিয়া (ইংরেজি)

কোনো তথ্য ভুল মনে হলে বা আরও ভালো সূত্র জানা থাকলে নিচে জানান; যাচাই করে ঠিক করা হবে।

বাগেরহাট সদর-এর আরও গল্প

সব দেখুন
সমাধির পাথরে লেখা শেষ কথাখানজাহানের সমাধিবেদির পাথরই তাঁর সম্পর্কে সবচেয়ে বিশ্বাসযোগ্য দলিল। সেখানে তিনি নিজেকে বলেছেন বৃদ্ধ, দুর্বল এক প্রবাসী—আর লিখে রেখেছেন মৃত্যুর তারিখ।প্রমাণিত ইতিহাসখলিফাতাবাদ: খানজাহানের পরের টাকশাল-শহর আর মোগল ‘সরকার’খানজাহানের মৃত্যুর পরও খলিফাতাবাদ হারিয়ে যায়নি। সুলতানদের মুদ্রায় এর নাম উঠেছে, মোগল রাজস্বের খাতায় এটি ছিল আস্ত এক ‘সরকার’—আর বাগেরহাটের ‘দশানী’ নামেও হয়তো লুকিয়ে আছে সেই হিসাবের ছাপ।প্রমাণিত ইতিহাসপ্রতাপাদিত্য, ফিরিঙ্গি আর মগ: বারো ভূঁইয়ার যুগে বাগেরহাটষোড়শ-সপ্তদশ শতকে যশোরের রাজা প্রতাপাদিত্যের রাজ্য ছুঁয়ে ছিল আজকের বাগেরহাট; একই সময়ে পর্তুগিজ ‘ফিরিঙ্গি’ আর আরাকানি মগ জলদস্যুর হানায় উজাড় হয়েছিল দক্ষিণের বহু জনপদ। কোনটা প্রমাণিত, কোনটা জনশ্রুতি?ইতিহাস ও জনশ্রুতিভৈরবের বাঁকে বাঁকে: নদী, হাট আর নৌপথের বাগেরহাটএকসময় বাগেরহাটে চলাফেরা মানেই ছিল নৌকা। কলকাতাগামী ধানের জাহাজ, মোড়েলগঞ্জের বন্দর, স্টিমারের হুইসেল—মরে আসা ভৈরব আর বদলে যাওয়া নদীপথের গল্প।প্রমাণিত ইতিহাস