খনন ও প্রাপ্ত নিদর্শন প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর ও সংবাদমাধ্যমে নথিভুক্ত। স্থানটি খানজাহানের নিজের বাসভবন ছিল—এটি জনশ্রুতি ও অনুমান; অধিদপ্তর একে খলিফাতাবাদ শহরের অংশ ‘হতে পারে’ বলেছে।
ষাট গম্বুজ মসজিদ থেকে প্রায় ৩০০ মিটার উত্তরে, পুরোনো ভৈরব নদের বাঁকের দক্ষিণ পাড়ে প্রায় ৯ একরের একটি উঁচু ঢিবি। লোকমুখে এটি খানজাহানের বসতভিটা। এক শতাব্দীরও বেশি আগে সতীশচন্দ্র মিত্র (১৯১৪) ষাট গম্বুজের উত্তরে ভৈরব তীরে খানজাহানের পরিখাঘেরা বাড়ির যে ধ্বংসাবশেষের বর্ণনা দিয়েছিলেন—ইটের স্তূপ, পড়ে থাকা একটি বড় পাথরের স্তম্ভ, বেষ্টনী প্রাচীর ও পরিখার চিহ্ন—তার অবস্থান এই ঢিবির সঙ্গে মেলে। প্রবাদ ছিল, নদীর দিকে ছিল বাড়ির সদর দরজা।
প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর এখানে প্রথম খনন করে ২০০১ সালে। বাংলাদেশ মনিটর ও বাংলা ট্রিবিউনের ২০২৩ সালের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০০৮ সাল থেকে ২০২২–২৩ অর্থবছর পর্যন্ত মোট ১২ দফা খনন হয়েছে। ২০২৩ সালের ৯ ফেব্রুয়ারি শুরু হওয়া খননের পর ২১ মার্চ সেখানে প্রাপ্ত নিদর্শনের প্রদর্শনী হয়; প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের আঞ্চলিক পরিচালক জানান, নিদর্শনগুলো বাগেরহাট জাদুঘরে রাখা হবে।
খননে যা বেরিয়ে এসেছে, তা একটি পরিকল্পিত আবাসিক বা প্রশাসনিক এলাকার ছবি দেয়। প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের বিবরণ অনুযায়ী পাওয়া গেছে দেয়ালঘেরা আলাদা আলাদা অংশে ভাগ করা ভবনের ভিত, চুন-সুরকি ও শামুক-ঝিনুকের গুঁড়ার মেঝে, সেপটিক ট্যাংকসহ পাকা শৌচাগার, পানি সরবরাহের প্রায় ১৭ মিটার লম্বা পোড়ামাটির পাইপ, ইটের ঢাকা নালা, চুন-বালি মেশানোর আধার, পুরোনো ভৈরবের পাড়ে ইটের ঘাট আর ইটে বাঁধানো রাস্তা। নোনা ও আর্দ্রতা ঠেকাতে দেয়ালে চুনের প্রলেপ দেওয়ার কৌশলও ধরা পড়েছে। কোণে টারেটযুক্ত একটি বর্গাকার স্থাপনার সীমানা প্রাচীরও মিলেছে।
মৃৎপাত্রগুলো সবচেয়ে বেশি কথা বলে। স্থানীয় হাঁড়ি-বাটির পাশাপাশি পারস্য প্রভাবের নলযুক্ত পাত্র, সুলতানি আমলের রাজকীয় নীল চকচকে পাত্র, আর চীন দেশের সেলাডন ও পোরসেলিনের বাটি-থালা পাওয়া গেছে। একই ধরনের পাত্র মিলেছে সুলতানি রাজধানী গৌড়েও। চীনা পাত্র কীভাবে এখানে এল—সরাসরি বাণিজ্যে, নাকি অন্য পথে—অধিদপ্তর বলছে, তা এখনো স্পষ্ট নয়। ষড়ভুজ, চতুর্ভুজ ও ত্রিভুজ আকারের রঙিন টালি আর ফুল-লতার নকশা করা ইটও পাওয়া গেছে।
বসতভিটা থেকে পূর্ব দিকে যাওয়া প্রায় এক কিলোমিটার লম্বা প্রাচীন রাস্তাটিকে খননে পাওয়া ইটের রাস্তার সমসাময়িক বলে মনে করছে অধিদপ্তর। তাদের সিদ্ধান্ত: এই প্রত্নস্থল মধ্যযুগের ‘শহর খলিফাতাবাদ’-এর অংশ হতে পারে। তবে এটিই যে খানজাহানের নিজের বাড়ি ছিল, তার কোনো লিখিত প্রমাণ এখনো মেলেনি; নামটি জনশ্রুতিনির্ভর। পুরো শহর ঘিরে কোনো নগরপ্রাচীরের প্রমাণও নেই; ইউনেস্কো বরং দুর্গপ্রাচীরের অনুপস্থিতিকেই খলিফাতাবাদের বৈশিষ্ট্য বলেছে, কারণ বিপদে সুন্দরবনের দুর্গম জলাভূমিতে সরে যাওয়ার সুযোগ ছিল।