মাটির নিচে খলিফাতাবাদ: খানজাহানের বসতভিটার খনন

প্রমাণিত ইতিহাসসুলতানি আমল ও খান জাহাননিদর্শন পনের শতকের; খনন ২০০১ ও ২০০৮–২০২৩সুন্দরঘোনা, ষাটগম্বুজ ইউনিয়ন, বাগেরহাট সদর

ষাট গম্বুজের ৩০০ মিটার উত্তরে এক ঢিবি খুঁড়ে বেরিয়ে এসেছে ইটের রাস্তা, পোড়ামাটির পানির পাইপ, সেপটিক ট্যাংকসহ শৌচাগার আর চীনা পোরসেলিন। ছয়শ বছর আগের এক পরিকল্পিত শহরের সাক্ষ্য।

খনন ও প্রাপ্ত নিদর্শন প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর ও সংবাদমাধ্যমে নথিভুক্ত। স্থানটি খানজাহানের নিজের বাসভবন ছিল—এটি জনশ্রুতি ও অনুমান; অধিদপ্তর একে খলিফাতাবাদ শহরের অংশ ‘হতে পারে’ বলেছে।

ষাট গম্বুজ মসজিদ থেকে প্রায় ৩০০ মিটার উত্তরে, পুরোনো ভৈরব নদের বাঁকের দক্ষিণ পাড়ে প্রায় ৯ একরের একটি উঁচু ঢিবি। লোকমুখে এটি খানজাহানের বসতভিটা। এক শতাব্দীরও বেশি আগে সতীশচন্দ্র মিত্র (১৯১৪) ষাট গম্বুজের উত্তরে ভৈরব তীরে খানজাহানের পরিখাঘেরা বাড়ির যে ধ্বংসাবশেষের বর্ণনা দিয়েছিলেন—ইটের স্তূপ, পড়ে থাকা একটি বড় পাথরের স্তম্ভ, বেষ্টনী প্রাচীর ও পরিখার চিহ্ন—তার অবস্থান এই ঢিবির সঙ্গে মেলে। প্রবাদ ছিল, নদীর দিকে ছিল বাড়ির সদর দরজা।

প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর এখানে প্রথম খনন করে ২০০১ সালে। বাংলাদেশ মনিটর ও বাংলা ট্রিবিউনের ২০২৩ সালের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০০৮ সাল থেকে ২০২২–২৩ অর্থবছর পর্যন্ত মোট ১২ দফা খনন হয়েছে। ২০২৩ সালের ৯ ফেব্রুয়ারি শুরু হওয়া খননের পর ২১ মার্চ সেখানে প্রাপ্ত নিদর্শনের প্রদর্শনী হয়; প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের আঞ্চলিক পরিচালক জানান, নিদর্শনগুলো বাগেরহাট জাদুঘরে রাখা হবে।

খননে যা বেরিয়ে এসেছে, তা একটি পরিকল্পিত আবাসিক বা প্রশাসনিক এলাকার ছবি দেয়। প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের বিবরণ অনুযায়ী পাওয়া গেছে দেয়ালঘেরা আলাদা আলাদা অংশে ভাগ করা ভবনের ভিত, চুন-সুরকি ও শামুক-ঝিনুকের গুঁড়ার মেঝে, সেপটিক ট্যাংকসহ পাকা শৌচাগার, পানি সরবরাহের প্রায় ১৭ মিটার লম্বা পোড়ামাটির পাইপ, ইটের ঢাকা নালা, চুন-বালি মেশানোর আধার, পুরোনো ভৈরবের পাড়ে ইটের ঘাট আর ইটে বাঁধানো রাস্তা। নোনা ও আর্দ্রতা ঠেকাতে দেয়ালে চুনের প্রলেপ দেওয়ার কৌশলও ধরা পড়েছে। কোণে টারেটযুক্ত একটি বর্গাকার স্থাপনার সীমানা প্রাচীরও মিলেছে।

মৃৎপাত্রগুলো সবচেয়ে বেশি কথা বলে। স্থানীয় হাঁড়ি-বাটির পাশাপাশি পারস্য প্রভাবের নলযুক্ত পাত্র, সুলতানি আমলের রাজকীয় নীল চকচকে পাত্র, আর চীন দেশের সেলাডন ও পোরসেলিনের বাটি-থালা পাওয়া গেছে। একই ধরনের পাত্র মিলেছে সুলতানি রাজধানী গৌড়েও। চীনা পাত্র কীভাবে এখানে এল—সরাসরি বাণিজ্যে, নাকি অন্য পথে—অধিদপ্তর বলছে, তা এখনো স্পষ্ট নয়। ষড়ভুজ, চতুর্ভুজ ও ত্রিভুজ আকারের রঙিন টালি আর ফুল-লতার নকশা করা ইটও পাওয়া গেছে।

বসতভিটা থেকে পূর্ব দিকে যাওয়া প্রায় এক কিলোমিটার লম্বা প্রাচীন রাস্তাটিকে খননে পাওয়া ইটের রাস্তার সমসাময়িক বলে মনে করছে অধিদপ্তর। তাদের সিদ্ধান্ত: এই প্রত্নস্থল মধ্যযুগের ‘শহর খলিফাতাবাদ’-এর অংশ হতে পারে। তবে এটিই যে খানজাহানের নিজের বাড়ি ছিল, তার কোনো লিখিত প্রমাণ এখনো মেলেনি; নামটি জনশ্রুতিনির্ভর। পুরো শহর ঘিরে কোনো নগরপ্রাচীরের প্রমাণও নেই; ইউনেস্কো বরং দুর্গপ্রাচীরের অনুপস্থিতিকেই খলিফাতাবাদের বৈশিষ্ট্য বলেছে, কারণ বিপদে সুন্দরবনের দুর্গম জলাভূমিতে সরে যাওয়ার সুযোগ ছিল।

গল্পের জায়গাগুলো

তথ্যসূত্র

  1. খানজাহান (র) এর বসতভিটা · প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর, খুলনা বিভাগ, ২০২৬
  2. বিশ্ব ঐতিহ্য খানজাহানের বসতভিটা খনন শুরু · বাংলাদেশ মনিটর, ২০২৩
  3. খানজাহান আলীর (রহ.) বসতভিটা খননে পাওয়া প্রত্নবস্তুর প্রদর্শনী · বাংলা ট্রিবিউন, ২০২৩
  4. যশোহর-খুলনার ইতিহাস, প্রথম খণ্ড — সতীশচন্দ্র মিত্র · চক্রবর্তী চ্যাটার্জি অ্যান্ড কোং, কলকাতা (ইন্টারনেট আর্কাইভে সংরক্ষিত), ১৯১৪
  5. Historic Mosque City of Bagerhat (Outstanding Universal Value) · UNESCO World Heritage Centre, ১৯৮৫

কোনো তথ্য ভুল মনে হলে বা আরও ভালো সূত্র জানা থাকলে নিচে জানান; যাচাই করে ঠিক করা হবে।

বাগেরহাট সদর-এর আরও গল্প

সব দেখুন
সমাধির পাথরে লেখা শেষ কথাখানজাহানের সমাধিবেদির পাথরই তাঁর সম্পর্কে সবচেয়ে বিশ্বাসযোগ্য দলিল। সেখানে তিনি নিজেকে বলেছেন বৃদ্ধ, দুর্বল এক প্রবাসী—আর লিখে রেখেছেন মৃত্যুর তারিখ।প্রমাণিত ইতিহাসখলিফাতাবাদ: খানজাহানের পরের টাকশাল-শহর আর মোগল ‘সরকার’খানজাহানের মৃত্যুর পরও খলিফাতাবাদ হারিয়ে যায়নি। সুলতানদের মুদ্রায় এর নাম উঠেছে, মোগল রাজস্বের খাতায় এটি ছিল আস্ত এক ‘সরকার’—আর বাগেরহাটের ‘দশানী’ নামেও হয়তো লুকিয়ে আছে সেই হিসাবের ছাপ।প্রমাণিত ইতিহাসপ্রতাপাদিত্য, ফিরিঙ্গি আর মগ: বারো ভূঁইয়ার যুগে বাগেরহাটষোড়শ-সপ্তদশ শতকে যশোরের রাজা প্রতাপাদিত্যের রাজ্য ছুঁয়ে ছিল আজকের বাগেরহাট; একই সময়ে পর্তুগিজ ‘ফিরিঙ্গি’ আর আরাকানি মগ জলদস্যুর হানায় উজাড় হয়েছিল দক্ষিণের বহু জনপদ। কোনটা প্রমাণিত, কোনটা জনশ্রুতি?ইতিহাস ও জনশ্রুতিভৈরবের বাঁকে বাঁকে: নদী, হাট আর নৌপথের বাগেরহাটএকসময় বাগেরহাটে চলাফেরা মানেই ছিল নৌকা। কলকাতাগামী ধানের জাহাজ, মোড়েলগঞ্জের বন্দর, স্টিমারের হুইসেল—মরে আসা ভৈরব আর বদলে যাওয়া নদীপথের গল্প।প্রমাণিত ইতিহাস