ইট খাড়া করে গাঁথা খানজাহানের রাস্তা

ইতিহাস ও জনশ্রুতিসুলতানি আমল ও খান জাহানপনের শতক (বিবরণ লিপিবদ্ধ ১৮৭১–১৯১৪)ষাটগম্বুজ থেকে বাগেরহাট শহরমুখী পুরোনো পথ, বাগেরহাট সদর

দেড়শ বছর আগে এক ইংরেজ কর্মকর্তা অবাক হয়ে লিখেছিলেন, চারশ বছর কোনো মেরামত ছাড়াই বাগেরহাটের একটি ইটের রাস্তা তখনো ব্যবহার হচ্ছে। খানজাহানের রাস্তার নির্মাণকৌশল আর চট্টগ্রাম পর্যন্ত রাস্তার কিংবদন্তি।

বাগেরহাটের ইটের রাস্তা ও তার নির্মাণকৌশল ১৮৭১, ১৯০৮ ও ১৯১৪ সালের সূত্রে এবং প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের খননে নথিভুক্ত। চট্টগ্রাম পর্যন্ত রাস্তা, বায়েজিদ বোস্তামীর সঙ্গে দেখা করতে যাওয়া ও সেতু ভাঙার কাহিনি জনশ্রুতি; অন্য জেলার সড়কগুলোর কথাও বাংলাপিডিয়ায় ‘শোনা যায়’ বলে উল্লেখিত।

খানজাহানকে নিয়ে যত গল্প, তার অনেকগুলোর কেন্দ্রে রাস্তা। প্রবাদ অনুযায়ী তিনি যেখান দিয়ে যেতেন, রাস্তা বানাতে বানাতে যেতেন আর পাশে দিঘি কাটতেন। বাংলাপিডিয়া শোনা কথা হিসেবে তাঁর নামে কয়েকটি সড়কের উল্লেখ করেছে: বাগেরহাট থেকে চট্টগ্রাম পর্যন্ত একটি মহাসড়ক, সামন্তসেনা থেকে বাঁধখালী পর্যন্ত প্রায় ২০ মাইলের রাস্তা, আর খুলনার শুভবাড়া থেকে দৌলতপুর পর্যন্ত রাস্তা। যশোর অঞ্চলে তাঁর নামের রাস্তাকে লোকে বলত ‘খাঞ্জালির জাঙ্গাল’—লিখেছেন সতীশচন্দ্র মিত্র।

বাগেরহাটে টিকে থাকা রাস্তার নির্মাণকৌশল প্রথম বিস্তারিত লেখেন যশোরের কালেক্টর জেমস ওয়েস্টল্যান্ড, ১৮৭১ সালে। ভৈরবের ঘাট থেকে প্রায় সোজা পশ্চিমে ষাট গম্বুজ পর্যন্ত যাওয়া এই রাস্তার ইট এখনকার ইটের চেয়ে ছোট—পাঁচ-ছয় ইঞ্চি বর্গ, দুই ইঞ্চির কম পুরু। ইটগুলো চ্যাপ্টা করে নয়, কাত করে খাড়া বসানো। লম্বালম্বি পাঁচটি সারি, প্রতিটি দুই ইট পুরু; মাঝের ফাঁকে আড়াআড়ি ইট। সব মিলিয়ে প্রায় দশ ফুট চওড়া পথ, সামান্য উঁচু বাঁধের ওপর। ওয়েস্টল্যান্ড অবাক হয়েছিলেন—চারশ বছর কোনো মেরামত ছাড়াই রাস্তাটি তখনো নিয়মিত ব্যবহার হচ্ছিল।

মিত্র (১৯১৪) একই কৌশল বর্ণনা করে লিখেছেন, পাঁচশ বছর আগে নিম্নবঙ্গে এমন পাকা রাস্তা আর কোথাও ছিল না। তিনিও আক্ষেপ করেছেন, লোকে রাস্তার ইট খুলে নিয়ে বাড়ির কাজে লাগাচ্ছিল। ১৯০৮ সালের খুলনা গেজেটিয়ারে আছে, ঘাট থেকে পশ্চিমে যাওয়া ৩২ ফুট চওড়া পুরোনো রাস্তাটি ‘খানজাহানের রাস্তা’ নামে পরিচিত, যার একটি শাখা দক্ষিণে তাঁর সমাধির দিকে গেছে। মগরা নদীর ওপর একটি ইটের সেতুর ধ্বংসাবশেষের কথাও গেজেটিয়ারে আছে।

চট্টগ্রামের রাস্তা নিয়ে আছে এক জনশ্রুতি। ওয়েস্টল্যান্ডকে স্থানীয়রা বলেছিলেন, চট্টগ্রামের সাধক বায়েজিদ বোস্তামীর সঙ্গে দেখা করতে যাওয়ার জন্যই খানজাহান রাস্তাটি বানিয়েছিলেন, পথে নদী-খালের ওপর সেতুও দিয়েছিলেন; পরে ‘জাঙ্গির খান’ নামে এক নবাব নাকি সেতুগুলো ভেঙে দেন। ওয়েস্টল্যান্ড নিজেই সন্দেহ করেছেন, মেঘনার মতো নদীর ওপর সেতু বানানো তাঁর পক্ষেও সম্ভব ছিল না। মিত্র লিখেছেন, বৈটপুর-কচুয়া হয়ে বলেশ্বর পার পর্যন্ত রাস্তার চিহ্ন মেলে, তারপর আর নিশ্চিত নিদর্শন নেই।

আজ খানজাহানের বসতভিটা প্রত্নস্থল থেকে পূর্ব দিকে প্রায় এক কিলোমিটার রাস্তা টিকে আছে। প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের মতে এটি খননে পাওয়া ইটের রাস্তার সমসাময়িক এবং ‘ঐতিহাসিক খানজাহানের রাস্তা’ নামে খ্যাত। ইউনেস্কোও খলিফাতাবাদের রাস্তা ও সেতুকে পরিকল্পনা-দক্ষতার প্রমাণ হিসেবে দেখেছে। প্রায় ছয়শ বছর পুরোনো এই পথে হাঁটা মানে খলিফাতাবাদের মানুষের পায়ের ছাপের ওপর দিয়েই হাঁটা।

গল্পের জায়গাগুলো

তথ্যসূত্র

  1. A Report on the District of Jessore: Its Antiquities, Its History, and Its Commerce — J. Westland · ইন্টারনেট আর্কাইভ (মূল প্রতিবেদন, কলকাতা), ১৮৭১
  2. যশোহর-খুলনার ইতিহাস, প্রথম খণ্ড — সতীশচন্দ্র মিত্র · চক্রবর্তী চ্যাটার্জি অ্যান্ড কোং, কলকাতা (ইন্টারনেট আর্কাইভে সংরক্ষিত), ১৯১৪
  3. Bengal District Gazetteers: Khulna — L. S. S. O'Malley · ইন্টারনেট আর্কাইভ (মূল প্রকাশ, কলকাতা), ১৯০৮
  4. খানজাহান (র) এর বসতভিটা · প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর, খুলনা বিভাগ, ২০২৬
  5. Khan Jahan · বাংলাপিডিয়া (এশিয়াটিক সোসাইটি অব বাংলাদেশ), ২০২১
  6. খান জাহান · বাংলাপিডিয়া (এশিয়াটিক সোসাইটি অব বাংলাদেশ), ২০১৫
  7. Historic Mosque City of Bagerhat (Outstanding Universal Value) · UNESCO World Heritage Centre, ১৯৮৫
  8. Trails of Khan Jahan Ali · দ্য ডেইলি স্টার, ২০১৯

কোনো তথ্য ভুল মনে হলে বা আরও ভালো সূত্র জানা থাকলে নিচে জানান; যাচাই করে ঠিক করা হবে।

বাগেরহাট সদর-এর আরও গল্প

সব দেখুন
সমাধির পাথরে লেখা শেষ কথাখানজাহানের সমাধিবেদির পাথরই তাঁর সম্পর্কে সবচেয়ে বিশ্বাসযোগ্য দলিল। সেখানে তিনি নিজেকে বলেছেন বৃদ্ধ, দুর্বল এক প্রবাসী—আর লিখে রেখেছেন মৃত্যুর তারিখ।প্রমাণিত ইতিহাসখলিফাতাবাদ: খানজাহানের পরের টাকশাল-শহর আর মোগল ‘সরকার’খানজাহানের মৃত্যুর পরও খলিফাতাবাদ হারিয়ে যায়নি। সুলতানদের মুদ্রায় এর নাম উঠেছে, মোগল রাজস্বের খাতায় এটি ছিল আস্ত এক ‘সরকার’—আর বাগেরহাটের ‘দশানী’ নামেও হয়তো লুকিয়ে আছে সেই হিসাবের ছাপ।প্রমাণিত ইতিহাসপ্রতাপাদিত্য, ফিরিঙ্গি আর মগ: বারো ভূঁইয়ার যুগে বাগেরহাটষোড়শ-সপ্তদশ শতকে যশোরের রাজা প্রতাপাদিত্যের রাজ্য ছুঁয়ে ছিল আজকের বাগেরহাট; একই সময়ে পর্তুগিজ ‘ফিরিঙ্গি’ আর আরাকানি মগ জলদস্যুর হানায় উজাড় হয়েছিল দক্ষিণের বহু জনপদ। কোনটা প্রমাণিত, কোনটা জনশ্রুতি?ইতিহাস ও জনশ্রুতিভৈরবের বাঁকে বাঁকে: নদী, হাট আর নৌপথের বাগেরহাটএকসময় বাগেরহাটে চলাফেরা মানেই ছিল নৌকা। কলকাতাগামী ধানের জাহাজ, মোড়েলগঞ্জের বন্দর, স্টিমারের হুইসেল—মরে আসা ভৈরব আর বদলে যাওয়া নদীপথের গল্প।প্রমাণিত ইতিহাস