একাত্তরের মার্চে অসহযোগ আন্দোলনের ঢেউ মোরেলগঞ্জেও পৌঁছায়। বাংলাদেশ মুক্তিযুদ্ধ জ্ঞানকোষের (এশিয়াটিক সোসাইটি, অষ্টম খণ্ড) মোরেলগঞ্জ-ভুক্তি অনুযায়ী, ৮ মার্চ থানা ছাত্রলীগ ও ছাত্র ইউনিয়নের নেতৃত্বে ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ গঠিত হয়; ১০ মার্চ আওয়ামী লীগ নেতা শেখ আব্দুল আজিজ এমএনএ এসে থানা সংগ্রাম কমিটি গঠন করেন, যার আহ্বায়ক ছিলেন আব্দুল লতিফ খান এমপিএ। ২৪ এপ্রিল পাকিস্তানি বাহিনী বাগেরহাটে হামলা চালালে তরুণেরা খাউলিয়া ও তেলিগাতীতে ছোট ছোট প্রশিক্ষণ ক্যাম্প খোলেন, কেউ কেউ প্রশিক্ষণ নিতে ভারতে যান; অনেকে যোগ দেন সুন্দরবনের মুক্তিবাহিনী ক্যাম্পে।
মে মাস থেকে নেমে আসে ধ্বংসযজ্ঞ। জ্ঞানকোষের বিবরণে, ৬ মে পিরোজপুর থেকে গানবোটে এসে পাকিস্তানি সেনারা চিংড়াখালী ইউনিয়নের বেতবুনিয়া গ্রামে ১৩৫ জনকে গুলি করে হত্যা করে এবং শতাধিক বাড়িতে আগুন দেয়। ১১ মে রাজাকার ও পাকিস্তানি সেনারা লঞ্চে মোরেলগঞ্জ বন্দরে নেমে হিন্দু সম্প্রদায়ের কয়েকজনকে গুলি করে মারে; একটি বাড়ির কয়েকটি ঘরে তালা দিয়ে আগুন লাগালে অনেকে পুড়ে মারা যান, বাজারের প্রায় তিন শ দোকান ও বসতঘর পুড়িয়ে দেওয়া হয়। বাংলাপিডিয়া অবশ্য বাজারের এই গণহত্যাকে মে মাসের শেষ দিকের ঘটনা বলেছে। এরপর ১২ মে মহিষপুরায় প্রায় ৫০ জন, ২৩ মে লক্ষ্মীখালীতে গোপাল সাধুর বাড়িতে আশ্রয় নেওয়া মানুষসহ ১৭৯ জন এবং ২৬ মে তেলিগাতীতে দুজন মুক্তিযোদ্ধা ও ২৫ জন সাধারণ মানুষ নিহত হন। হিন্দু-অধ্যুষিত গ্রামগুলোতে লুটপাট আর নারী নির্যাতন ছিল ব্যাপক।
দখলদার বাহিনী থানার কাছে বারইখালী ইউনিয়ন কাউন্সিলের দোতলা ভবন এবং দৈবজ্ঞহাটির একটি জমিদারবাড়িতে ক্যাম্প বসায়; কয়েকটি পাকা ভবন নির্যাতনকেন্দ্র হিসেবে ব্যবহৃত হয়। প্রতিরোধও থেমে থাকেনি। ১৭ মে রাতে কবির আহমেদ মধুর নেতৃত্বে তিন দিক থেকে মোরেলগঞ্জ রাজাকার ক্যাম্পে হামলা হয়—রাজাকাররা অস্ত্র ফেলে পালায়, শহীদ হন মুক্তিযোদ্ধা আবু বকর ছিদ্দিক। ১৫ আগস্ট সুন্দরবন সাব-সেক্টরের অধিনায়ক জিয়াউদ্দিনের নেতৃত্বে দ্বিতীয় দফা হামলায় সারা রাত লড়াইয়ের পর শতাধিক রাজাকার ধরা পড়ে, উদ্ধার হয় শতাধিক রাইফেল। ১৯ সেপ্টেম্বর দৈবজ্ঞহাটি খালের লড়াইয়ে শহীদ হন সুধীর কুমার সাহা। ৭ নভেম্বর সরালিয়ায় অ্যামবুশ এবং ১৩ নভেম্বর রাজাপুরের যুদ্ধের পর পাকিস্তানি সেনা ও রাজাকাররা শরণখোলার দিকে পিছু হটে।
জ্ঞানকোষ অনুযায়ী ১৩ ডিসেম্বর মোরেলগঞ্জ হানাদারমুক্ত হয়। উপজেলার খেতাবপ্রাপ্ত মুক্তিযোদ্ধা বারইখালীর আলী আহমেদ খান, বীর প্রতীক। বেতবুনিয়া, হোগলাবুনিয়া, মোরেলগঞ্জ ও দৈবজ্ঞহাটিতে গণকবর চিহ্নিত হয়েছে। উপজেলা চত্বরে সাত বীরশ্রেষ্ঠের প্রতিকৃতি ও শহীদদের নামসহ মুক্তিযোদ্ধা স্মৃতিফলক, পানগুছির পাড়ে সোলমবাড়িয়া খেয়াঘাটে ২০১৩ সালে মাঝি সমিতির উদ্যোগে নির্মিত ভাস্কর্য, আর বারইখালী সেতুর কাছে ‘বিজয়’ স্তম্ভ সেই দিনগুলোর কথা মনে করিয়ে দেয়।
এই লেখার সংখ্যা ও তারিখ মূলত মুক্তিযুদ্ধ জ্ঞানকোষ থেকে নেওয়া; সূত্রভেদে কিছু তারিখে অমিল আছে, আর নিহতদের প্রকৃত সংখ্যা নিশ্চিতভাবে জানা কঠিন। স্থানীয় বিবরণে কয়েকজন সহযোগীর নাম থাকলেও এসব নির্দিষ্ট ঘটনায় আদালতের কোনো রায় আমরা খুঁজে পাইনি, তাই এখানে কারও নাম দেওয়া হয়নি।