৩৬০ মসজিদের শহর: কোথায় গেল সব?

ইতিহাস ও জনশ্রুতিসুলতানি আমল ও খান জাহানপনের শতক থেকে বর্তমানঐতিহাসিক মসজিদের শহর বাগেরহাট, বাগেরহাট সদর

প্রবাদ বলে, খানজাহান ৩৬০টি মসজিদ বানিয়েছিলেন। আজ টিকে আছে হাতে গোনা কয়েকটি। বাকিগুলো হারিয়ে গেছে জঙ্গলে, লবণে, আর মানুষের ঘরবাড়ির দেয়ালে।

৩৬০টি মসজিদ ও দিঘির সংখ্যা প্রবাদ; ইউনেস্কোও সংখ্যাটি উল্লেখ করেছে, তবে প্রকৃত গণনার প্রমাণ নেই। টিকে থাকা স্থাপনা ও ১৯১৪ সালে মসজিদ ভেঙে ইট নেওয়ার বিবরণ নথিভুক্ত। সাবেকডাঙ্গা ভবনটি খানজাহানের প্রার্থনাঘর—এটি জনশ্রুতি।

বাগেরহাটে খানজাহানকে নিয়ে সবচেয়ে প্রচলিত কথা—তিনি ৩৬০টি মসজিদ বানিয়েছিলেন, ৩৬০টি দিঘি কেটেছিলেন। জেলা তথ্য বাতায়ন লিখেছে, কথিত আছে তাঁর সঙ্গে ৩৬০ জন আউলিয়া এসেছিলেন, তাঁদের সংখ্যার সঙ্গে মিল রেখেই এই সংখ্যা। ১৮৭১ সালে জেমস ওয়েস্টল্যান্ডকেও স্থানীয়রা একই কথা বলেছিলেন, মসজিদ-দিঘিগুলোর নাম নাকি খানজাহানের প্রধান অনুচরদের নামে। ইউনেস্কোর বিবরণেও ৩৬০টি মসজিদের উল্লেখ আছে।

সংখ্যাটি কতটা আক্ষরিক? সতীশচন্দ্র মিত্র (১৯১৪) মনে করিয়ে দিয়েছিলেন, বারোজন সঙ্গী নিয়ে এসে পরে ৩৬০ জন হওয়ার প্রবাদ শ্রীহট্টের শাহজালালের কাহিনিতেও আছে; ১২ মাস আর ৩৬০ দিনের হিসাবের মতো সংখ্যা দুটি মানুষের কাছে পরিচিত বলেই হয়তো বারবার ফিরে আসে। তবে তিনি এটাও লিখেছেন, পুরো অঞ্চলের জঙ্গলে খুঁজলে যত মসজিদের ধ্বংসাবশেষ মেলে, তাতে ৩৬০ সংখ্যাকে অবিশ্বাস করার কারণ থাকে না; শতাধিক মসজিদের চিহ্ন তখনো দেখা যেত।

আজ টিকে আছে তার সামান্যই। ইউনেস্কো ৫০টির বেশি স্থাপনা তালিকাভুক্ত করেছে, দুটি অঞ্চলে ভাগ করে—পশ্চিমে ষাট গম্বুজ ঘিরে সিংগাইর, বিবি বেগনী ও চুনাখোলা মসজিদ; পূর্বে খানজাহানের সমাধি ঘিরে রেজা খোদা, জিন্দাপীর ও রণবিজয়পুর মসজিদ। ঠাকুর দিঘির পশ্চিম পাড়ের নয় গম্বুজ মসজিদে দুই সারি পাথরের স্তম্ভ নয়টি নিচু গম্বুজ ধরে রেখেছে। চুনাখোলা মসজিদ দাঁড়িয়ে আছে ধানক্ষেতের মাঝখানে; এর নকশায় খাঁটি খানজাহানি রীতি থেকে পরের যুগের দিকে উত্তরণের চিহ্ন দেখেন গবেষকেরা। রেজা খোদা মসজিদের এখন শুধু পশ্চিম দেয়ালের কিছু অংশ আর মিহরাব টিকে আছে; নকশা দেখে ছয় গম্বুজের বলে ধারণা, আর কোনো কোনো পণ্ডিত একে খানজাহানের মৃত্যুর পরের নির্মাণ মনে করেন। সাবেকডাঙ্গার মিহরাবহীন ছোট ভবনটিকে জনশ্রুতি খানজাহানের প্রার্থনাঘর বলে, যদিও এর আসল ব্যবহার অমীমাংসিত।

বাকিগুলো গেল কোথায়? খানজাহানের মৃত্যুর পর শহর জঙ্গলে ঢেকে যায়। পরে যাঁরা বসতি গড়েন, তাঁদের কাছে পুরোনো মসজিদ ছিল সহজলভ্য ইটের উৎস। মিত্র তাঁর সময়ের একটি তালিকা দিয়েছেন: ঠাকুর দিঘির দক্ষিণে এক দিঘির পাড়ের মসজিদ ভেঙে নেওয়া হয়েছে; মগরা গ্রামের এক বিশাল মসজিদ বিক্রি হয়ে গেছে; কোতোয়ালি চৌতারার ভবন ভেঙে নেওয়া হয়েছে; কাঁঠাল গ্রামের দুটি মসজিদের ইটে বাড়ি বানানো হয়েছে, আর ষাট গম্বুজের পাশের বাদামতলার কয়েকটি মসজিদ লোকে আত্মসাৎ করেছে। যাঁদের বাড়ি বানানোর সামর্থ্য ছিল না, তাঁরাও সিঁড়ি বা দরজায় সেই ইট লাগিয়েছেন। গুপ্তধনের আশায় খোঁড়াখুঁড়িও ক্ষতি করেছে।

আজ যেগুলো টিকে আছে, সেগুলোর বেশির ভাগই সংরক্ষিত পুরাকীর্তি এবং ১৯৮৫ সাল থেকে বিশ্ব ঐতিহ্যের অংশ। তবু ইউনেস্কো বলছে, মাটি ও বাতাসের লবণাক্ততা আর অননুমোদিত কর্মকাণ্ড এখনো বড় ঝুঁকি। মিত্রের বর্ণনা মনে করিয়ে দেয়, খলিফাতাবাদের অনেক মসজিদ পুরোপুরি হারিয়ে যায়নি—ছড়িয়ে গেছে আশপাশের ঘরবাড়ির দেয়ালে।

গল্পের জায়গাগুলো

ষাট গম্বুজ মসজিদ

দর্শনীয় স্থান · সুন্দরঘোনা, ষাটগম্বুজ

এখনো রিভিউ নেই
এখন বন্ধ · খুলবে সকাল ১০টা

সিংগাইর মসজিদ

দর্শনীয় স্থান · সুন্দরঘোনা

এখনো রিভিউ নেই

বিবি বেগনী মসজিদ

দর্শনীয় স্থান · মগরা

এখনো রিভিউ নেই

চুনাখোলা মসজিদ

দর্শনীয় স্থান · মগরা (চুনাখোলা)

এখনো রিভিউ নেই

নয় গম্বুজ মসজিদ

দর্শনীয় স্থান · ঠাকুরদিঘি

এখনো রিভিউ নেই

জিন্দাপীর মসজিদ ও মাজার

দর্শনীয় স্থান · রণবিজয়পুর

এখনো রিভিউ নেই

রেজা খোদা মসজিদ

দর্শনীয় স্থান · সুন্দরঘোনা

এখনো রিভিউ নেই

রণবিজয়পুর মসজিদ

দর্শনীয় স্থান · রণবিজয়পুর

এখনো রিভিউ নেই

সাবেকডাঙ্গা পুরাকীর্তি (প্রার্থনা কক্ষ)

দর্শনীয় স্থান · সাবেকডাঙ্গা (কাড়াপাড়া ইউনিয়ন)

এখনো রিভিউ নেই

তথ্যসূত্র

  1. Historic Mosque City of Bagerhat (Outstanding Universal Value) · UNESCO World Heritage Centre, ১৯৮৫
  2. হযরত খানজাহান আলী (রঃ) ও তাঁর মাজার · বাগেরহাট জেলা তথ্য বাতায়ন, ২০১৯
  3. A Report on the District of Jessore: Its Antiquities, Its History, and Its Commerce — J. Westland · ইন্টারনেট আর্কাইভ (মূল প্রতিবেদন, কলকাতা), ১৮৭১
  4. যশোহর-খুলনার ইতিহাস, প্রথম খণ্ড — সতীশচন্দ্র মিত্র · চক্রবর্তী চ্যাটার্জি অ্যান্ড কোং, কলকাতা (ইন্টারনেট আর্কাইভে সংরক্ষিত), ১৯১৪
  5. এক নজরে — বিশ্ব সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য: ঐতিহাসিক মসজিদের শহর বাগেরহাট · প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর, বাগেরহাট, ২০২৪
  6. Chunakhola Mosque · উইকিপিডিয়া (ইংরেজি)
  7. Mosque City of Bagerhat · উইকিপিডিয়া (ইংরেজি)
  8. Rediscovering Bagerhat's forgotten grandeur · দ্য ফিন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেস, ২০২৫

কোনো তথ্য ভুল মনে হলে বা আরও ভালো সূত্র জানা থাকলে নিচে জানান; যাচাই করে ঠিক করা হবে।

বাগেরহাট সদর-এর আরও গল্প

সব দেখুন
সমাধির পাথরে লেখা শেষ কথাখানজাহানের সমাধিবেদির পাথরই তাঁর সম্পর্কে সবচেয়ে বিশ্বাসযোগ্য দলিল। সেখানে তিনি নিজেকে বলেছেন বৃদ্ধ, দুর্বল এক প্রবাসী—আর লিখে রেখেছেন মৃত্যুর তারিখ।প্রমাণিত ইতিহাসখলিফাতাবাদ: খানজাহানের পরের টাকশাল-শহর আর মোগল ‘সরকার’খানজাহানের মৃত্যুর পরও খলিফাতাবাদ হারিয়ে যায়নি। সুলতানদের মুদ্রায় এর নাম উঠেছে, মোগল রাজস্বের খাতায় এটি ছিল আস্ত এক ‘সরকার’—আর বাগেরহাটের ‘দশানী’ নামেও হয়তো লুকিয়ে আছে সেই হিসাবের ছাপ।প্রমাণিত ইতিহাসপ্রতাপাদিত্য, ফিরিঙ্গি আর মগ: বারো ভূঁইয়ার যুগে বাগেরহাটষোড়শ-সপ্তদশ শতকে যশোরের রাজা প্রতাপাদিত্যের রাজ্য ছুঁয়ে ছিল আজকের বাগেরহাট; একই সময়ে পর্তুগিজ ‘ফিরিঙ্গি’ আর আরাকানি মগ জলদস্যুর হানায় উজাড় হয়েছিল দক্ষিণের বহু জনপদ। কোনটা প্রমাণিত, কোনটা জনশ্রুতি?ইতিহাস ও জনশ্রুতিভৈরবের বাঁকে বাঁকে: নদী, হাট আর নৌপথের বাগেরহাটএকসময় বাগেরহাটে চলাফেরা মানেই ছিল নৌকা। কলকাতাগামী ধানের জাহাজ, মোড়েলগঞ্জের বন্দর, স্টিমারের হুইসেল—মরে আসা ভৈরব আর বদলে যাওয়া নদীপথের গল্প।প্রমাণিত ইতিহাস