খানজাহানের নামাজঘর হওয়ার কথা জনশ্রুতি। হিন্দু ইমারত হওয়ার দাবি পর্যটন করপোরেশনের পাতার এবং কয়েকজন প্রত্নতাত্ত্বিকের মত; ১৯৯৩ সালের গবেষণার সূত্র পাওয়া যায়নি। মাপ ও সংরক্ষণের তথ্য প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের।
ষাটগম্বুজ মসজিদ থেকে উত্তর-পূর্বে, কাড়াপাড়া ইউনিয়নের সাবেকডাঙ্গা গ্রামে দাঁড়িয়ে আছে একটি ছোট লাল ইটের ইমারত। প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের বাগেরহাট কার্যালয় এর অবস্থান দিয়েছে ষাটগম্বুজ থেকে প্রায় তিন কিলোমিটার উত্তর-পূর্বে এবং জেলা শহর থেকে আট কিলোমিটার দূরে; সদর উপজেলা পোর্টালে লেখা ষাটগম্বুজ থেকে প্রায় ছয় কিলোমিটার উত্তরে। স্থানীয়ভাবে একে কেউ বলেন সাবেকডাঙ্গা মসজিদ, কেউ নামাজঘর, কেউ শুধু পুরাকীর্তি।
ইমারতটি আয়তাকার: বাইরের মাপ ৭.৮৮ মিটার × ৫.১০ মিটার, ভেতরে ৫.৫৯ × ৩.৫১ মিটার, দেয়াল ১.৪৭ মিটার পুরু। ঢোকার পথ মাত্র একটি, দক্ষিণ দেয়ালে। কার্নিশ ধনুকের মতো বাঁকা; উইকিপিডিয়ার বর্ণনায় ছাদ গ্রামের কুঁড়েঘরের মতো চারচালা ধাঁচের। ভেতরের দেয়ালে পোড়ামাটির ফুল-লতাপাতার কারুকাজ এখনো অবিকৃত। প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের বিবরণে আছে, গ্রামের ধ্বংসস্তূপ থেকে এটি উদ্ধার হয়েছিল; বাইরের দেয়াল সংস্কার করা হলেও ভেতরে কোনো পরিবর্তন করা হয়নি। অধিদপ্তরের তথ্যমতে ১৯৮৯ সালে এটি সংরক্ষিত পুরাকীর্তি ঘোষিত হয় এবং এটি ‘ঐতিহাসিক মসজিদের শহর বাগেরহাট’ বিশ্ব ঐতিহ্যের অংশ হিসেবে তালিকাভুক্ত।
রহস্যটা এর ব্যবহার নিয়ে। মসজিদ হলে পশ্চিম দেয়ালে মিহরাব থাকার কথা, কিন্তু এখানে তা নেই; নেই কোণের বুরুজও। তাই প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর নিজেই লিখেছে, এর ব্যবহারিক উদ্দেশ্য অমীমাংসিত, সম্ভবত এটি প্রার্থনাগৃহ। জনশ্রুতি আছে, খানজাহান সুন্দরবন অঞ্চলে ইসলাম প্রচারের সময় বিভিন্ন জায়গায় বিশেষ উদ্দেশ্যে এমন প্রার্থনাঘর বানিয়েছিলেন, সাবেকডাঙ্গা তারই একটি। অধিদপ্তর এটিকে খানজাহানের সময়ের (পঞ্চদশ শতক) বলে ধারণা করলেও সদর উপজেলা পোর্টাল স্থাপত্যকৌশল দেখে বলছে, এটি খানজাহানের পরবর্তীকালে নির্মিত।
সম্পূর্ণ ভিন্ন মত দিয়েছে বাংলাদেশ পর্যটন করপোরেশনের পাতা। সেখানে লেখা, ইমারতের দেয়ালে শেয়ালসহ নানা প্রাণীর টেরাকোটা ফলক ছিল, ভেতরে কোনো মিহরাব ছিল না, এবং প্রাণীর ফলকে সাজানো এই ইমারত যে হিন্দুদের ছিল, তাতে সন্দেহ নেই; হাল আমলে একে মসজিদে রূপান্তর করা হয়েছে। বাংলা উইকিপিডিয়াও উল্লেখ করেছে, কয়েকজন প্রত্নতাত্ত্বিক স্থাপত্যরীতি দেখে একে হিন্দু মন্দির বলেছেন, আবার ১৯৯৩ সালের এক গবেষণায় একে মন্দিরও নয়, মসজিদও নয়, বরং একটি প্রার্থনাকক্ষ বলা হয়েছে। তবে ওই গবেষণার সূত্র উইকিপিডিয়ায় দেওয়া নেই।
ফলে সাবেকডাঙ্গা আজও এক খোলা প্রশ্ন। একই ইমারতকে ঘিরে মুসলিম ও হিন্দু দুই ঐতিহ্যের দাবি, আর নির্ভরযোগ্য প্রমাণের অভাবে কোনো মতই চূড়ান্ত নয়। দর্শনার্থীর জন্য সবচেয়ে মূল্যবান জিনিসটি তাই ভেতরের দেয়ালের পোড়ামাটির অলংকরণ, যা কয়েক শতাব্দী ধরে এ অঞ্চলের কারিগরদের দক্ষতার সাক্ষ্য দিচ্ছে, ইমারতটি যিনিই বানিয়ে থাকুন।