রূপসা–বাগেরহাট রেল: আশি বছরের এক ছোট ট্রেনের গল্প

প্রমাণিত ইতিহাসব্রিটিশ আমল১৯১৬–২০১২পূর্ব রূপসা থেকে বাগেরহাট শহর

১৯১৮ সালের ১০ জুন রূপসার পূর্ব পাড় থেকে বাগেরহাটের পথে ছুটেছিল প্রথম ছোট লাইনের ট্রেন। আশি বছর পর লোকসানের কথা বলে বন্ধ হয় লাইন, ২০১২ সালে নিলামে ওঠে শেষ সম্পদটুকুও।

খুলনা শহর থেকে রূপসা নদী পার হলেই পূর্ব রূপসা ঘাট। সেখান থেকে বাগেরহাট পর্যন্ত প্রায় ৩২ কিলোমিটার (২০ মাইল) জুড়ে একসময় চলত একটি ছোট রেললাইন। বাংলা ও ইংরেজি উইকিপিডিয়া অনুযায়ী এর নির্মাণ শুরু ১৯১৬ সালে, ট্রেন চলাচল শুরু ১৯১৮ সালের ১০ জুন। লাইনটি ছিল ২ ফুট ৬ ইঞ্চি (৭৬২ মিলিমিটার) মাপের ন্যারোগেজ। বাংলাপিডিয়ার ‘রেলওয়ে’ নিবন্ধ জানায়, ৩২ কিলোমিটারের লাইনটি ১৯১৮ সালের জুনের মধ্যে নির্মাণ করেছিল ইস্টার্ন বেঙ্গল রেলওয়ে, আর ১৯৪৮–৪৯ সালে রাষ্ট্র এটি অধিগ্রহণ করে।

পথে ছিল ১০টি স্টেশন: পূর্ব রূপসা, কর্ণপুর, সামন্তসেনা, বাহিরদিয়া, মূলঘর, খানজাহানপুর, যাত্রাপুর, ষাটগম্বুজ রোড, বাগেরহাট কলেজ ও বাগেরহাট। দেশের মূল রেল নেটওয়ার্কের সঙ্গে এর কোনো সংযোগ ছিল না; বাংলা উইকিপিডিয়া একে দেশের একমাত্র বিচ্ছিন্ন রেলপথ বলেছে। ইংরেজি উইকিপিডিয়া হিউ হিউজের রেল-ইতিহাস গ্রন্থের সূত্রে জানায়, ১৯৫৮ সালে এই লাইনে চলত পাঁচটি বাষ্পচালিত ইঞ্জিন, ১৩টি যাত্রীবাহী কোচ ও ৮টি মালবাহী ওয়াগন। ষাটের দশকের শেষে লাইনটি ব্রডগেজে রূপান্তরিত হয়; উইকিপিডিয়া সালটি ১৯৬৯ বলেছে, আর বাংলাপিডিয়া বলছে ১৯৭০ সালের মে মাসের মধ্যে রূপান্তর শেষে ট্রেন চলাচল শুরু হয়।

এই ট্রেন ছিল সাধারণ মানুষের বাহন। প্রথম আলোর উপবার্তা সম্পাদক কাজী আলিম-উজ-জামান ২০২২ সালের এক কলামে স্মৃতিচারণা করেছেন: যাত্রী ছিলেন বাগেরহাটে অফিস করতে যাওয়া সরকারি-বেসরকারি কর্মচারী, খুলনা-বাগেরহাটের বাজারে সবজি নিয়ে যাওয়া গরিব ব্যবসায়ী আর ছাত্রছাত্রীরা। মূলঘর স্টেশনে প্রায়ই বসত ভ্রাম্যমাণ আদালত, যা লোকমুখে ‘মোবিল কোর্ট’; বিনা টিকিটে ধরা পড়লে দিনের রোজগার জরিমানাতেই চলে যেত। একাত্তরেও এই লাইন যুদ্ধের অংশ হয়েছিল: মুক্তিযুদ্ধ জ্ঞানকোষ অনুযায়ী পাকিস্তানি সেনাদের অগ্রযাত্রা ঠেকাতে প্রতিরোধযোদ্ধারা রেললাইন উপড়ে ফেলেন, আর দ্য ডেইলি স্টারের প্রতিবেদন অনুযায়ী ২৪ জুলাই রফিক বাহিনী রূপসা থেকে বাগেরহাটগামী রাজাকারবাহী একটি ট্রেনে হামলা চালায়।

লাইন বন্ধের প্রক্রিয়া শুরু হয় নব্বইয়ের দশকে। প্রথম আলোর কলাম অনুযায়ী ১৯৯৫ সালে বন্ধের উদ্যোগ নেওয়া হয় এবং ১৯৯৮ সালে রূপসা–বাগেরহাট শাখা লাইন বন্ধের আদেশ আসে; উইকিপিডিয়াও লোকসানের কারণে ১৯৯৮ সালে বন্ধের কথা বলেছে। বাংলাপিডিয়া আবার লিখেছে, যাত্রী কম থাকায় লাভজনক নয় বলে ১৯৯৪ থেকে ১৯৯৭ সালের মধ্যে আরও কয়েকটি শাখার সঙ্গে রূপসা–বাগেরহাট অংশটিও বন্ধ হয়। কলাম অনুযায়ী ২০০৬–০৭ সালে রেললাইন ও অন্যান্য সম্পদ তুলে নেওয়া হয়, আর ২০১২ সালে সব সম্পদ নিলামে বিক্রি করে শাখা লাইনটিকে বিলুপ্ত ঘোষণা করা হয়।

বন্ধের পর থেকে খুলনা–বাগেরহাটের যাত্রীদের ভরসা শুধু সড়কপথ। ২০১৪ সালে ফিন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেসে এক পাঠক চিঠি লিখে লাইনটি আবার চালুর দাবি জানান; ২০২২ সালের কলামেও একই দাবি। বাংলা উইকিপিডিয়া জানায়, পুরোনো রেলপথ এখন সড়ক হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে; বাগেরহাট শহরে মিঠাপুকুরের কাছে ওপেনস্ট্রিটম্যাপে ‘রেলরোড বাইপাস (পুরাতন রুপসা বাগেরহাট) রোড’ নামটি সেই স্মৃতিই বহন করে। আর পর্যটন করপোরেশনের পাতায় আজও কোদলা মঠের দূরত্ব মাপা হয় ‘যাত্রাপুর রেল স্টেশন’ থেকে, যে স্টেশন বহু বছর আগেই হারিয়ে গেছে।

গল্পের জায়গাগুলো

তথ্যসূত্র

  1. খুলনা–বাগেরহাট রেলপথ · উইকিপিডিয়া, ২০২৬
  2. Rupsha East–Bagerhat Railway · Wikipedia, ২০২৬
  3. Railway (Quazi Abul Fida) · বাংলাপিডিয়া, ২০২১
  4. দক্ষিণে রেল যোগাযোগ ও বিস্মৃত এক রেললাইনের গল্প (কাজী আলিম-উজ-জামান) · প্রথম আলো, ২০২২
  5. Rupsha-Bagerhat railway services (letter) · The Financial Express, ২০১৪
  6. বাগেরহাট রেলওয়ে স্টেশন · উইকিপিডিয়া, ২০২৬
  7. মুক্তিযুদ্ধে বাগেরহাটের রফিক বাহিনী (আহমাদ ইশতিয়াক) · দ্য ডেইলি স্টার বাংলা, ২০২৪
  8. মুক্তিযুদ্ধে বাগেরহাট সদর উপজেলা (সূত্র: বাংলাদেশ মুক্তিযুদ্ধ জ্ঞানকোষ, ৬ষ্ঠ খণ্ড) · সংগ্রামের নোটবুক
  9. বাগেরহাট জেলা (পর্যটন আকর্ষণ) · বাংলাদেশ পর্যটন করপোরেশন, ২০২০
  10. রেলরোড বাইপাস (পুরাতন রুপসা বাগেরহাট) রোড · OpenStreetMap, ২০২৬

কোনো তথ্য ভুল মনে হলে বা আরও ভালো সূত্র জানা থাকলে নিচে জানান; যাচাই করে ঠিক করা হবে।

বাগেরহাট সদর-এর আরও গল্প

সব দেখুন
সমাধির পাথরে লেখা শেষ কথাখানজাহানের সমাধিবেদির পাথরই তাঁর সম্পর্কে সবচেয়ে বিশ্বাসযোগ্য দলিল। সেখানে তিনি নিজেকে বলেছেন বৃদ্ধ, দুর্বল এক প্রবাসী—আর লিখে রেখেছেন মৃত্যুর তারিখ।প্রমাণিত ইতিহাসখলিফাতাবাদ: খানজাহানের পরের টাকশাল-শহর আর মোগল ‘সরকার’খানজাহানের মৃত্যুর পরও খলিফাতাবাদ হারিয়ে যায়নি। সুলতানদের মুদ্রায় এর নাম উঠেছে, মোগল রাজস্বের খাতায় এটি ছিল আস্ত এক ‘সরকার’—আর বাগেরহাটের ‘দশানী’ নামেও হয়তো লুকিয়ে আছে সেই হিসাবের ছাপ।প্রমাণিত ইতিহাসপ্রতাপাদিত্য, ফিরিঙ্গি আর মগ: বারো ভূঁইয়ার যুগে বাগেরহাটষোড়শ-সপ্তদশ শতকে যশোরের রাজা প্রতাপাদিত্যের রাজ্য ছুঁয়ে ছিল আজকের বাগেরহাট; একই সময়ে পর্তুগিজ ‘ফিরিঙ্গি’ আর আরাকানি মগ জলদস্যুর হানায় উজাড় হয়েছিল দক্ষিণের বহু জনপদ। কোনটা প্রমাণিত, কোনটা জনশ্রুতি?ইতিহাস ও জনশ্রুতিভৈরবের বাঁকে বাঁকে: নদী, হাট আর নৌপথের বাগেরহাটএকসময় বাগেরহাটে চলাফেরা মানেই ছিল নৌকা। কলকাতাগামী ধানের জাহাজ, মোড়েলগঞ্জের বন্দর, স্টিমারের হুইসেল—মরে আসা ভৈরব আর বদলে যাওয়া নদীপথের গল্প।প্রমাণিত ইতিহাস