স্থাপত্যের মাপ, গম্বুজ-স্তম্ভের সংখ্যা ও ১৯৮৫ সালের ইউনেস্কো স্বীকৃতি নথিভুক্ত। নামের ব্যাখ্যাগুলো পণ্ডিতদের অনুমান; ভবনটি খানজাহানের দরবার-ঘর ছিল, এটি স্থানীয় প্রবাদ, যা ১৯০৮ সালের গেজেটিয়ার বিশ্বাসযোগ্য মনে করেনি।
বাংলাদেশের সুলতানি আমলের সবচেয়ে বড় মসজিদ ষাট গম্বুজ, দাঁড়িয়ে আছে ঘোড়া দিঘির পূর্ব পাড়ে। বাংলাপিডিয়া অনুযায়ী এর বাইরের মাপ ৪৮.৭৭ × ৩২.৯২ মিটার। ভেতরে দশ সারিতে ছয়টি করে মোট ৬০টি স্তম্ভ; পূর্ব দেয়ালে ১১টি, উত্তর ও দক্ষিণে ৭টি করে দরজা; পশ্চিম দেয়ালে ১০টি মিহরাব, যার মাঝেরটি ধূসর বেলেপাথরের। মসজিদে কোনো শিলালিপি পাওয়া যায়নি, তাই নির্মাণের সঠিক সাল অজানা; খানজাহানের আমলে, অর্থাৎ ১৪৫৯ সালের আগে তৈরি বলে ধরা হয়। কিছু অনলাইন সূত্রে ১৪৪২–১৪৫৯ লেখা থাকলেও এর পক্ষে লিখিত প্রমাণ মেলেনি।
নাম ষাট গম্বুজ হলেও ছাদে গম্বুজ ৭৭টি—সাত সারিতে এগারোটি করে। এর মধ্যে মাঝের সারির সাতটি বাংলার চৌচালা ঘরের ছাদের মতো, বাকি ৭০টি গোল। চার কোণের চার মিনারের মাথার গম্বুজ ধরলে মোট ৮১। তাহলে ‘ষাট’ কেন? বাংলাপিডিয়া দুটি ব্যাখ্যা দিয়েছে: সাতটি চৌচালা ছাদ থেকে ‘সাত গম্বুজ’, যা কালক্রমে ‘ষাট গম্বুজ’; অথবা ৬০টি স্তম্ভের কারণে ‘ষাট খামবাজ’, যা বিকৃত হয়ে ‘গম্বুজ’। লেখক এম এ বারি দ্বিতীয়টিকেই বেশি সম্ভাব্য মনে করেছেন।
আরও মত আছে। ১৯০৮ সালের খুলনা গেজেটিয়ার বলেছে, হয়তো গোল সংখ্যার প্রতি মানুষের ঝোঁক থেকে ‘ষাট’, অথবা ‘সাতাত্তর গম্বুজ’ থেকে সংক্ষেপে ‘সাত গম্বুজ’। সতীশচন্দ্র মিত্র (১৯১৪) লিখেছেন, স্থানীয় লোকে মসজিদটিকে ‘ষাটগুমট’ বা ‘ষাটঘোমট’ বলত। ২০১৮ সালে ইউএনবির এক প্রতিবেদনে প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের কর্মকর্তাদের মত উদ্ধৃত হয়েছে—গম্বুজকে এ অঞ্চলে ‘ছাদ’ বলা হতো, তাই ‘ছাদ গম্বুজ’ থেকে ‘ষাট গম্বুজ’। কোনো মতই চূড়ান্তভাবে প্রমাণিত নয়।
এটি কি শুধুই মসজিদ? জেমস ওয়েস্টল্যান্ড (১৮৭১) ও মিত্র স্থানীয় প্রবাদ লিখে রেখেছেন যে এটি খানজাহানের দরবার-ঘরও ছিল; মাঝের সারির উত্তরে ইটের একটি বেদিতে বসে তিনি নাকি রাজস্ব ও বিচারের কাজ করতেন। সামনের দুই মিনারের প্যাঁচানো সিঁড়ির একটির নাম ‘রোশন কোঠা’, অন্যটির ‘আন্ধার কোঠা’; মুয়াজ্জিন এগুলোতে উঠে আজান দিতেন। তবে গেজেটিয়ার স্পষ্ট বলেছে, মিহরাব ও গঠনশৈলী দেখে এটি নিঃসন্দেহে মসজিদ; দরবার-ঘরের গল্পকে তারা বিশ্বাসযোগ্য মনে করেনি। আজও এখানে নিয়মিত নামাজ হয়।
উনিশ শতকে মসজিদের ছাদ জঙ্গলে ঢাকা ছিল, অনেক গম্বুজ ভেঙে পড়েছিল। উইকিপিডিয়ার তথ্য অনুযায়ী ১৯০৩–০৪ সালে মেরামত শুরু হয় এবং ১৯০৭–০৮ সালে ২৮টি গম্বুজ সংস্কার করা হয়। মিত্র ১৯১৪ সালে দেখেছিলেন, তখনো ১৫টি গম্বুজ ভাঙা। পরে পাকিস্তান ও বাংলাদেশের প্রত্নতত্ত্ব বিভাগ এবং ইউনেস্কোর সহায়তায় সংরক্ষণ চলে। ১৯৮৫ সালে ‘ঐতিহাসিক মসজিদের শহর বাগেরহাট’ বিশ্ব ঐতিহ্যের তালিকায় ওঠে। তবে ইউনেস্কো সতর্ক করেছে, মাটি ও বাতাসের লবণাক্ততা আজও বড় হুমকি, আর আগের সংস্কারে ভেতরের পাথরের স্তম্ভের মতো কিছু মূল বৈশিষ্ট্য হারিয়ে গেছে।