পাথর এল কোথা থেকে? ভাসিয়ে আনার কিংবদন্তি

ইতিহাস ও জনশ্রুতিসুলতানি আমল ও খান জাহানপনের শতক (জনশ্রুতি লিপিবদ্ধ ১৮৭১–১৯১৪)ষাটগম্বুজ মসজিদ ও খানজাহান আলী মাজার, বাগেরহাট সদর

পলিমাটির বাগেরহাটে পাথর নেই, অথচ ষাট গম্বুজের স্তম্ভ আর খানজাহানের সমাধি পাথরের। লোকে বলে, খানজাহান অলৌকিক ক্ষমতায় পাথর ভাসিয়ে এনেছিলেন। পুরোনো দলিল কী বলে?

পাথর ভাসিয়ে আনা এবং বায়েজিদ বোস্তামীর উক্তি জনশ্রুতি। চট্টগ্রাম থেকে পাথর আনার কথাও প্রবাদনির্ভর; রাজমহলের দাবি পত্রিকা-সূত্রে, গবেষণায় যাচাই হয়নি। পুরোনো স্থাপনার পাথর পুনর্ব্যবহারের কথা মিত্রের অনুমান।

বাগেরহাট পলিমাটির দেশ; আশপাশে কোথাও পাথরের খনি নেই। অথচ ষাট গম্বুজের ৬০টি স্তম্ভ, মাঝের মিহরাব আর খানজাহানের সমাধির ভিত ও বেদি ধূসর ও কালো পাথরের। ১৮৭১ সালে জেমস ওয়েস্টল্যান্ড অবাক হয়ে লিখেছিলেন, গোটা গাঙ্গেয় বদ্বীপে এমন পাথর মেলে না। আর এই রাজমিস্ত্রিরাই বা এলেন কোথা থেকে—সে প্রশ্নও তিনি তুলেছিলেন। এই প্রশ্ন থেকেই জন্ম নিয়েছে বাগেরহাটের সবচেয়ে জনপ্রিয় কিংবদন্তিগুলোর একটি।

লোকমুখে প্রচলিত আছে, খানজাহান অলৌকিক ক্ষমতায় দূরদেশ থেকে পাথরগুলো পানিতে ভাসিয়ে এনেছিলেন। ২০২৫ সালে ফিন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেসের এক ফিচারে এই জনশ্রুতির উল্লেখ আছে—কারও মতে পাথর এসেছিল চট্টগ্রাম থেকে, কারও মতে ভারতের রাজমহল থেকে। বাংলা উইকিপিডিয়া কালের কণ্ঠের ২০১০ সালের এক প্রতিবেদনের সূত্রে লিখেছে, পাথর আনা হয়েছিল রাজমহল থেকে। তবে ‘ভাসিয়ে আনা’র কোনো ঐতিহাসিক প্রমাণ নেই; এটি ভক্তির গল্প।

পুরোনো লিখিত সূত্রগুলো চট্টগ্রামের দিকেই ইঙ্গিত করে। ওয়েস্টল্যান্ড (১৮৭১) ও খুলনা গেজেটিয়ার (১৯০৮) দুটিতেই আছে, প্রবাদ অনুযায়ী খানজাহান চট্টগ্রাম থেকে পাথর আনিয়েছিলেন। সতীশচন্দ্র মিত্র (১৯১৪) এর সঙ্গে যোগ করেছেন একটি মজার জনশ্রুতি। পাথর চেয়ে খানজাহান চট্টগ্রামে চিঠি পাঠালে সেখানকার সাধক বায়েজিদ বোস্তামী নাকি ঠাট্টা করে বলেছিলেন, ‘দেড়বুড়ির ভারানী, তার চাটিগাঁয় বরাত’—অর্থাৎ সামান্য মানুষের এত বড় আবদার! পরে খানজাহানের নিষ্ঠা দেখে সাধক সদয় হন, আর খানজাহান নাকি তাঁর সঙ্গে দেখা করতে চট্টগ্রামে যেতেন। মিত্র লিখেছেন, ছোট মানুষের বড় আশা দেখলে খুলনা অঞ্চলে তখনো এই প্রবাদ বলা হতো।

পাথরবোঝাই নৌকা কোথায় ভিড়ত, সে কথাও মিত্র শুনেছিলেন: বলেশ্বর ও ভৈরব হয়ে মগরা খালে ঢুকে নৌকা থামত ‘জাহাজঘাটা’য়, তারপর গরুর গাড়িতে পাথর যেত নানা জায়গায়। সেখানে মাটিতে পোঁতা একটি পাথরের স্তম্ভ তিনি নিজে দেখেছিলেন। গেজেটিয়ারেও মগরা নদীর পাড়ে ‘পাথরের ঘাট’ নামে এক ঘাটের ধ্বংসাবশেষের উল্লেখ আছে।

মিত্র আরেকটি বাস্তব সম্ভাবনার কথাও লিখেছেন: আগে থেকে থাকা পুরোনো হিন্দু-বৌদ্ধ স্থাপনার পাথরও নতুন নির্মাণে ব্যবহার হয়ে থাকতে পারে। জাহাজঘাটার স্তম্ভটির গায়ে অষ্টভুজা মহিষমর্দিনীর মূর্তি খোদাই ছিল বলে সেটি কাজে লাগানো হয়নি—এটি তাঁর অনুমান। পাথরের প্রকৃত উৎস নিয়ে কোনো ভূতাত্ত্বিক বা প্রত্নতাত্ত্বিক গবেষণা আমরা খুঁজে পাইনি। বাংলাপিডিয়া জানায়, ষাট গম্বুজের সরু পাথরের স্তম্ভগুলো পরে সংস্কারের সময় ইটের আস্তরে মোড়া হয়েছে, তাই আজ পাথর দেখাও কঠিন।

গল্পের জায়গাগুলো

তথ্যসূত্র

  1. A Report on the District of Jessore: Its Antiquities, Its History, and Its Commerce — J. Westland · ইন্টারনেট আর্কাইভ (মূল প্রতিবেদন, কলকাতা), ১৮৭১
  2. Bengal District Gazetteers: Khulna — L. S. S. O'Malley · ইন্টারনেট আর্কাইভ (মূল প্রকাশ, কলকাতা), ১৯০৮
  3. যশোহর-খুলনার ইতিহাস, প্রথম খণ্ড — সতীশচন্দ্র মিত্র · চক্রবর্তী চ্যাটার্জি অ্যান্ড কোং, কলকাতা (ইন্টারনেট আর্কাইভে সংরক্ষিত), ১৯১৪
  4. Rediscovering Bagerhat's forgotten grandeur · দ্য ফিন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেস, ২০২৫
  5. ষাট গম্বুজ মসজিদ · উইকিপিডিয়া (বাংলা)
  6. Shatgumbad Mosque · বাংলাপিডিয়া (এশিয়াটিক সোসাইটি অব বাংলাদেশ)
  7. Khan Jahan's Tomb, Bagerhat · বাংলাপিডিয়া (এশিয়াটিক সোসাইটি অব বাংলাদেশ), ২০২১

কোনো তথ্য ভুল মনে হলে বা আরও ভালো সূত্র জানা থাকলে নিচে জানান; যাচাই করে ঠিক করা হবে।

বাগেরহাট সদর-এর আরও গল্প

সব দেখুন
সমাধির পাথরে লেখা শেষ কথাখানজাহানের সমাধিবেদির পাথরই তাঁর সম্পর্কে সবচেয়ে বিশ্বাসযোগ্য দলিল। সেখানে তিনি নিজেকে বলেছেন বৃদ্ধ, দুর্বল এক প্রবাসী—আর লিখে রেখেছেন মৃত্যুর তারিখ।প্রমাণিত ইতিহাসখলিফাতাবাদ: খানজাহানের পরের টাকশাল-শহর আর মোগল ‘সরকার’খানজাহানের মৃত্যুর পরও খলিফাতাবাদ হারিয়ে যায়নি। সুলতানদের মুদ্রায় এর নাম উঠেছে, মোগল রাজস্বের খাতায় এটি ছিল আস্ত এক ‘সরকার’—আর বাগেরহাটের ‘দশানী’ নামেও হয়তো লুকিয়ে আছে সেই হিসাবের ছাপ।প্রমাণিত ইতিহাসপ্রতাপাদিত্য, ফিরিঙ্গি আর মগ: বারো ভূঁইয়ার যুগে বাগেরহাটষোড়শ-সপ্তদশ শতকে যশোরের রাজা প্রতাপাদিত্যের রাজ্য ছুঁয়ে ছিল আজকের বাগেরহাট; একই সময়ে পর্তুগিজ ‘ফিরিঙ্গি’ আর আরাকানি মগ জলদস্যুর হানায় উজাড় হয়েছিল দক্ষিণের বহু জনপদ। কোনটা প্রমাণিত, কোনটা জনশ্রুতি?ইতিহাস ও জনশ্রুতিভৈরবের বাঁকে বাঁকে: নদী, হাট আর নৌপথের বাগেরহাটএকসময় বাগেরহাটে চলাফেরা মানেই ছিল নৌকা। কলকাতাগামী ধানের জাহাজ, মোড়েলগঞ্জের বন্দর, স্টিমারের হুইসেল—মরে আসা ভৈরব আর বদলে যাওয়া নদীপথের গল্প।প্রমাণিত ইতিহাস